জ্বালানি নিয়ে ভারত কঠিন সমীকরণের সামনে
· Prothom Alo

ভারত কার কাছ থেকে তেল কিনবে—প্রশ্নটি দেখলে মনে হয় এটি শুধু অর্থনীতির বিষয়। কিন্তু বিষয়টি এর চেয়ে গভীর। আসল প্রশ্ন হলো, ভারত তার জ্বালানি নীতি কীভাবে ঠিক করবে? শুধু বাজারদর দেখে, নাকি বড় শক্তিগুলোর চাপ সামলে কৌশলগত ভারসাম্য রেখে?
Visit milkshakeslot.com for more information.
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ। তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশই বাইরে থেকে আনতে হয়। তাই জ্বালানি নীতি কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়।
এটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে যুক্ত। ভারতের জন্য জ্বালানিনিরাপত্তা মানে তিনটি বিষয় একসঙ্গে দেখা। দাম, সরবরাহের নিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি। এ পটভূমিতে রাশিয়ার তেল ও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ভারতের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
দীর্ঘদিন ভারত দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে। কম দাম ও স্থিতিশীল সরবরাহ। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন তেলের বাজার শুধু বাজার নয়। এটি নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক ও জোট রাজনীতির অংশ হয়ে গেছে।
ভারতের ক্ষেত্রেও বিষয়টি স্পষ্ট। রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র শুল্কের চাপ দিয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন নির্বাহী ক্ষমতা নিয়ে আইনি বিতর্কও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আইইইপিএ আইন প্রয়োগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ আলোচনায় এসেছে।
তাই এখন প্রশ্ন শুধু কোথা থেকে তেল কেনা হবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, কীভাবে কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রেখে জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে।
ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে উচ্চ শুল্কের হুমকি দেয়। যুক্তি ছিল, ভারত রাশিয়ার তেল কিনে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলকে দুর্বল করছে। আগস্টে অনেক ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানো হয়। বার্তা ছিল স্পষ্ট। রাশিয়ার তেল কিনলে শুল্কের চাপ বাড়বে।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া কম দামে তেল বিক্রি শুরু করে। ২০২১ সালে ভারতের তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ ছিল ২ শতাংশের কম। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ হয়। অল্প সময়েই রাশিয়া ভারতের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী হয়ে ওঠে।
কম দামের এই তেল ভারতের রিফাইনারি ও ভোক্তাদের জন্য স্বস্তি আনে। তাই ভারতের সিদ্ধান্ত ছিল বাস্তববাদী। আদর্শের প্রশ্ন নয়, অর্থনীতি ও জ্বালানিনিরাপত্তাই ছিল প্রধান বিবেচনা।
সমস্যা শুরু হয় যখন ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত করতে চাপ দেয়। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল, ভারত পশ্চিমা কৌশলগত কাঠামোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হোক। ফলে ভারত দুই দিক থেকে চাপে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র চায় রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমুক। রাশিয়া চায় পুরোনো প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সম্পর্ক অটুট থাকুক।
দেশের ভেতরেও অসন্তোষ তৈরি হয়। বিশেষ করে কৃষিবাজার আংশিক উন্মুক্ত করা ও মার্কিন পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি নিয়ে। বিরোধীরা অভিযোগ তোলে, এতে ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। দীর্ঘদিন দিল্লি কোনো একক শক্তির সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত হয়নি। শীতল যুদ্ধের সময় নিরপেক্ষতা ছিল নীতি। পরে মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট। অর্থাৎ একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের অবস্থান শক্ত রাখা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বেড়েছে। আবার রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক ও জ্বালানি সম্পর্কও বজায় আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এ ভারসাম্যকে কঠিন করে তুলেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, ভারত কি বাজারের যুক্তি মেনে চলবে, নাকি জোট রাজনীতির চাপে সিদ্ধান্ত বদলাবে?
ভারতকে তিনটি বিষয় একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখা; রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং দেশের ভেতরে রাজনৈতিক স্থিতি ও সার্বভৌমত্বের ভাবমূর্তি রক্ষা করা। কাজটি সহজ নয়। এখন তেল আমদানি শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি আন্তর্জাতিক অবস্থানের সংকেতও দেয়।
ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে উচ্চ শুল্কের হুমকি দেয়। যুক্তি ছিল, ভারত রাশিয়ার তেল কিনে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলকে দুর্বল করছে। আগস্টে অনেক ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানো হয়। বার্তা ছিল স্পষ্ট। রাশিয়ার তেল কিনলে শুল্কের চাপ বাড়বে।
এ পরিস্থিতিতে ভারত একটি বাণিজ্যচুক্তিতে রাজি হয়। এতে শুল্কের বড় ঝুঁকি এড়ানো যায়। তবে শর্ত ছিল, রাশিয়ার তেল আমদানি কমাতে হবে। অর্থাৎ শুল্ক ও জ্বালানি নীতি একসঙ্গে জড়িয়ে যায়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বলে, আইইইপিএ আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। এতে প্রশাসনের পদক্ষেপ আইনি প্রশ্নের মুখে পড়ে। কিন্তু বাস্তবতা বদলায়নি। আন্তর্জাতিক রাজনীতি আদালতের রায়ে চলে না। সেখানে শক্তির ভারসাম্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা বড় বিষয়।
এখন দিল্লির সামনে প্রশ্ন, আইনি ভিত্তি দুর্বল হলে কি আগের প্রতিশ্রুতি বদলানো যাবে, নাকি আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার জন্য চুক্তি বজায় রাখতে হবে? চুক্তি ভাঙলে কূটনৈতিক সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চুক্তি রাখলে বিরোধীরা বলবে, ভারত চাপের কাছে নতিস্বীকার করেছে। এখানেই জটিলতা।
বাস্তবে ভারত রাশিয়ার তেল আমদানি কিছুটা কমিয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ করেনি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও ইরাক থেকে আমদানি বাড়িয়েছে।
ভারত-ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতা যে কারণে ‘ভালো বার্তা’ নয়আন্তর্জাতিক ডেটা ও অ্যানালিটিক্স প্রতিষ্ঠান কেপলারেরতথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতেও ভারতে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল রুশ তেল আমদানি হয়েছে। অর্থাৎ ভারত সম্পর্ক পুরো ছিন্ন করেনি; বরং ঝুঁকি কমিয়ে বিকল্প বাড়ানোর পথ নিয়েছে।
মোদি সরকার বলছে, সব সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থে নেওয়া হয়। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের মানে কী। কম দামে তেল কিনে স্থিতিশীলতা রাখা, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক গভীর করা। দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য করাই এখন চ্যালেঞ্জ। চীন বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। সীমান্ত উত্তেজনা ভারতের জন্য বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাও দরকার। দুই দিক সামলানো কঠিন।
বিশ্বরাজনীতি এখন আরও মেরুকৃত। বড় শক্তিগুলো বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও জ্বালানিকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এ অবস্থায় ভারত মাঝামাঝি অবস্থান ধরে রাখতে পারবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। ভারতের সামনে পথ কঠিন। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা দরকার, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে পুরোনো সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি দেশের ভেতরে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে হবে।
আজ জ্বালানি নীতি শুধু অর্থনীতি নয়। এটি সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত পরিচয়ের অংশ। কোন দেশ থেকে তেল কেনা হচ্ছে, সেটিও একটি রাজনৈতিক বার্তা। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তেলের নয়। প্রশ্নটি হলো, ভারত কি নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখতে পারবে, নাকি একসময় তাকে স্পষ্টভাবে কোনো এক পক্ষ বেছে নিতে হবে? এই দড়ির ওপর ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন দিল্লির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সানজিদা বারী ডক্টরাল ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়, শিকাগো
*মতামত লেখকের নিজস্ব