ইরানের হয়ে লড়ছে ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো, যুদ্ধে কী প্রভাব পড়ছে
· Prothom Alo

তেহরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যৌথ অভিযানের পাল্টা জবাব হিসেবে ইরানের পক্ষ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হামলা জোরদার করছে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। এই যুদ্ধে নতুন নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠীর যুক্ত হওয়া জটিলতার পাশাপাশি সহিংসতা আরও ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
Visit milkshakeslot.com for more information.
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এখন লক্ষ্যবস্তু করেছে ইরানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ককে। তাতে অনেকটা গোপন এই লড়াইয়ে ইরাক একটি প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল ও জর্ডান এবং খোদ ইরাকে থাকা মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে কয়েক ডজন হামলা চালায় ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তারা উত্তর ইরাকের কুর্দি–অধ্যুষিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে ইরানি-কুর্দিবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর অবকাঠামোতেও হামলা চালিয়েছে।
বিশ্লেষক এবং আঞ্চলিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা এবং স্থলে বিশেষ বাহিনীর অভিযান চালিয়ে ইরাকে থাকা ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর শক্তি কমানোর চেষ্টা করছে।
ইসরায়েল চল্লিশ বছর ধরে যেভাবে ইরানে যুদ্ধের ছক কষেছেসম্প্রতি উত্তর ইরাকের এরবিল বিমানবন্দরের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দায় স্বীকার করেছে ইরান-সমর্থিত বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। জর্ডানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় মরুভূমি থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। কুয়েতেও ছোড়া হয়েছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র।
২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্র এবং ইরানের মধ্যে একটি ছায়া যুদ্ধক্ষেত্রে (প্রক্সি ব্যাটলগ্রাউন্ড) পরিণত হয়েছিল ইরাক। তবে দেশটির বর্তমান নেতারা এই নতুন সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এড়াতে চাইছেন।
ইরাকের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া সম্প্রদায় থেকে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। তারা ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ মেনে চলেন।
অঞ্চলজুড়ে ছায়াযুদ্ধ তীব্র হওয়ার লক্ষণ হিসেবে গত মঙ্গলবার ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাঁরা ইরানি-কুর্দিদের সংগঠিত করার কথা ভাবছেন। সম্ভবত ইরানের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে আক্রমণের উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
সম্প্রতি উত্তর ইরাকের এরবিল বিমানবন্দরের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দায় স্বীকার করেছে ইরান-সমর্থিত বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী।
এ ছাড়া জর্ডানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় মরুভূমি থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কুয়েতে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালাতে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছে রাশিয়ামাইকেল নাইটস, ইরাকবিষয়ক বিশেষজ্ঞ‘ইরাকে এমন কিছু স্বল্পপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে, যেগুলো এত দূরের পথ পাড়ি দিয়ে ইসরায়েল থেকে আসা সম্ভব নয়। গত বছর (ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার) যুদ্ধেও আমরা ঠিক এমনটাই দেখেছিলাম। এটি ইঙ্গিত দেয় যে মাঠে কোনো গোপন অভিযান চলছে। সেখানে ব্যাপকভাবে ছায়াযুদ্ধ হচ্ছে।’গতকাল বৃহস্পতিবার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো একটি যৌথ বিবৃতি দিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোকে এই যুদ্ধে না জড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। একই সঙ্গে ইরাক এবং ওই অঞ্চলে থাকা ইউরোপীয় বাহিনী ও ঘাঁটিগুলোর ওপর হামলার হুমকিও দিয়েছে।
ইরাকের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরাকি নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দক্ষিণ ইরাকের বসরা প্রদেশ থেকে ‘প্রতিবেশী একটি দেশে’ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার চেষ্টা নস্যাৎ করা হয়েছে এবং দুটি ক্ষেপণাস্ত্রসহ একটি ভ্রাম্যমাণ লঞ্চিং প্যাডও জব্দ করেছে নিরাপত্তা বাহিনী, যেগুলো উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত ছিল।
গত বুধবার সন্ধ্যায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন, ইরাক থেকে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ড্রোন ছোড়া হয়েছে। যদিও এর সংখ্যা ‘খুব বেশি ছিল না’।
নিউইয়র্কভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘হরাইজন এনগেজ’-এর ইরাকবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল নাইটস বলেন, ইরান-সমর্থিত ইরাকি গোষ্ঠীগুলো চেষ্টা করছে কীভাবে তারা প্রাসঙ্গিক থাকতে পারে এবং কীভাবে তারা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার প্রতিক্রিয়া জানাবে।
এদিকে এক গোপন পাল্টা হামলায় বাগদাদের দক্ষিণে এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নাসিরিয়া ও বসরার কাছাকাছি থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটিগুলো ছোট ‘সুইসাইড ড্রোন’ হামলার শিকার হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে ১৫ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। এদের বেশির ভাগই ইরাকভিত্তিক ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ‘কাতায়েব হিজবুল্লাহ’-এর সদস্য।
ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’–এর হিজবুল্লাহ লেবানন থেকে সক্রিয় হলেও ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস এবং ইয়েমেনের হুতি এখন পর্যন্ত বর্তমান সংঘাত থেকে নিজেদের অনেকটা দূরে রেখেছে।
মাইকেল নাইটস বলেন, ‘ইরাকে এমন কিছু স্বল্পপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে, যেগুলো এত দূরের পথ পাড়ি দিয়ে ইসরায়েল থেকে আসা সম্ভব নয়। গত বছর (ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার) যুদ্ধেও আমরা ঠিক এমনটাই দেখেছিলাম। এটি ইঙ্গিত দেয় যে মাঠে কোনো গোপন অভিযান চলছে। সেখানে ব্যাপকভাবে ছায়াযুদ্ধ হচ্ছে।’
গত বৃহস্পতিবার কাতায়েব হিজবুল্লাহ জানায়, আগের দিন দক্ষিণ ইরাকে এক হামলায় তাদের এক কমান্ডার নিহত হয়েছেন।
বুধবার এই গোষ্ঠীর দুটি সূত্র বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছিল, দক্ষিণ ইরাকে তাদের প্রধান ঘাঁটির কাছে একটি গাড়িতে হামলায় দুই যোদ্ধা নিহত হন। পরে কমান্ডারের মৃত্যুতে এই সংখ্যা বেড়ে তিনে দাঁড়ায়।
গত সপ্তাহান্ত থেকে গোষ্ঠীটির জুরফ আল-নাসর ঘাঁটিতে বারবার হামলা চালানো হচ্ছে। ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলীয় আনবার প্রদেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটিতে বড় ধরনের বিস্ফোরণের খবরও পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া বেশ কয়েকটি ব্যাখ্যাতীত বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে ইরাকের আকাশসীমায় উড়োজাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সরকারি রাডার ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলের সাবেক দুই ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, তাঁরা এই বিস্ফোরণগুলোর বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারছেন না। তবে এর পেছনে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা বা বিশেষ বাহিনীর হাত থাকার ধারণাটি ‘বিশ্বাসযোগ্য’। তৃতীয় আরেক কর্মকর্তা বলেন, এর সঙ্গে মার্কিন বাহিনীও যুক্ত থাকতে পারে।
নকল সামরিক লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে শত্রুকে কি বোকা বানাচ্ছে ইরানইরান নিজের ওপর হামলা ঠেকাতে এবং পুরো অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে কয়েক দশক ধরে ভারত মহাসাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর একটি জোট গঠনে বিনিয়োগ করেছে।
লেবাননের হিজবুল্লাহ এই সংঘাতে যুক্ত হওয়ার পর সেখানে ব্যাপক হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলার পাশাপাশি সাইপ্রাসে একটি ব্রিটিশ ঘাঁটির দিকেও ড্রোন ছুড়েছিল।
তবে তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স) ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ফলে মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির সূত্রপাত হয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, যখন এই অক্ষের অন্যতম সদস্য হামাস ইসরায়েলে একটি আকস্মিক হামলা চালায়, যা দীর্ঘ যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়।
ফিলিস্তিনের ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস এবং ইয়েমেনের হুতি—উভয়ের সঙ্গেই তেহরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে তারা এখন পর্যন্ত বর্তমান সংঘাত থেকে নিজেদের অনেকটা দূরে রেখেছে।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক রেনাদ মানসুর বলেন, ‘এটি পুরোপুরি টিকে থাকার লড়াই ...আর তাদের টিকে থাকার এই হিসাব-নিকাশ যে সব সময় ইরানের টিকে থাকার সঙ্গে যুক্ত থাকবে, এমনটা নয়।’
দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের পথে মধ্যপ্রাচ্যইরানের মিত্র ও ছায়াগোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাধীন বিশ্লেষক ফিলিপ স্মিথ বলেন, তেহরান হয়তো হুতিদের ভবিষ্যতের জন্য ‘রিজার্ভে’ রেখে দিচ্ছে। তবে ইরানি শাসনব৵বস্থার যদি পতন ঘটে—এমন ভাবনা থেকেও হয়তো হুতি নেতারা ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমাতে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা রেখেছেন।
ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে দুর্বল করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সেদেশের জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্য থেকে ছায়া-গোষ্ঠী (প্রক্সি) ব্যবহার করতে পারে, এমন আরেকটি লক্ষণ দেখা গেছে। ইরানের আরব সম্প্রদায়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে আইআরজিসির বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
ইরাক সীমান্তের নিকটবর্তী ইরানের শহর আহওয়াজে অবস্থিত আইআরজিসির একটি ঘাঁটিতে হামলার দায় স্বীকার করেছে আপাতদৃষ্টে নতুন গঠিত একটি গোষ্ঠী, যারা নিজেদের ‘আহওয়াজ ফ্যালকনস’ নামে পরিচয় দিচ্ছে।
ইরানে দ্রুত জয়ের কথা ভাবছিলেন ট্রাম্প, কিন্তু তাঁর সব হিসাব–নিকাশ পাল্টে যাচ্ছে