রোজা : নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ

· Prothom Alo

দ্বিতীয় হিজরিতে রোজা ফরজ হয়—যে সময় মুসলিম সমাজ অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। তখন দরিদ্রদের সাহায্য, আত্মরক্ষা এবং ইসলামের ভিত্তি সুদৃঢ় করার জন্য জান-মাল ব্যয়ের প্রয়োজন ছিল অপরিসীম।

Visit catcross.biz for more information.

এমন প্রেক্ষাপটে রোজা ফরজ হওয়ার অর্থ হলো—মুমিনদের আত্মিকভাবে শক্তিশালী ও সংযমী করে তোলা, যাতে তারা বৃহত্তর দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত হয়। রোজা তাদের ভোগ-বিলাস থেকে দূরে রেখে আত্মত্যাগের মানসিকতা গড়ে তোলে।

রোজার বিধান ধাপে ধাপে প্রবর্তিত হয়েছে। প্রথমে রোজা রাখা বা ফিদয়া দেওয়ার বিকল্প ছিল। পরে তা রহিত করে বাধ্যতামূলক করা হয়, “তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পাবে, সে যেন রোজা রাখে।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)

কোরআন, সুরা আনফাল, আয়াত: ২৪আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার মধ্যে রয়েছে প্রকৃত জীবন।

তবে অসুস্থ ও মুসাফিরদের জন্য ছাড় রাখা হয়েছে, যা ইসলামের সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিকে প্রতিফলিত করে। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; কঠিন করতে চান না।”

পবিত্র কোরআন নাজিলের মাস রমজান

আবার অন্যত্র ঘোষণা করেছেন—“তিনি ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করেননি।” (সুরা হজ্জ, আয়াত: ৭৮)

এতে স্পষ্ট হয়, ইসলাম মানুষের সাধ্যের প্রতি সদা সংবেদনশীল।

রোজার আয়াতের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর নৈকট্যের ঘোষণা এসেছে, “আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আমি তো নিকটবর্তী; যে আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।” (সুরা বাকারা: ১৮৬)

এটি রোজার আত্মিক দিককে উন্মোচিত করে। রোজা মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে শেখায়। কিন্তু দোয়া কবুলের শর্ত হলো—আল্লাহর নির্দেশ মান্য করা এবং তাঁর ডাকে সাড়া দেওয়া। নিছক মুখের কথা যথেষ্ট নয়; জীবনের কর্মক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নই প্রকৃত দোয়ার পরিচায়ক।

আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার মধ্যে রয়েছে প্রকৃত জীবন। (সুরা আনফাল, আয়াত: ২৪)

আবার আল্লাহকে সাহায্য করলে আল্লাহ সাহায্য করবেন—এই প্রতিশ্রুতিও কোরআনে এসেছে। (সুরা মুহাম্মদ: ৭)

এসব আয়াত দেখায়, রোজা কেবল আত্মিক অনুশীলন নয়; বরং কর্মমুখর, সংগ্রামী ও দায়িত্বশীল জীবন গঠনের প্রেরণা।

চোখের রোজা পালন করছি তো
রমজান তাই কেবল না–খেয়ে থাকার মাস নয়; বরং আত্মগঠন, সমাজগঠন ও আল্লাহকেন্দ্রিক পূর্ণাঙ্গ জীবন প্রতিষ্ঠার মাস।

রোজা মানুষকে নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ শিখায়—ক্ষুধা, কামনা-বাসনা ও ভোগলালসার বিরুদ্ধে আত্মসংযম। একই সঙ্গে এটি সামাজিক জিহাদের প্রস্তুতি—অন্যায়, জুলুম ও ফিতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার মানসিক শক্তি সঞ্চার করে।

রোজার মাধ্যমে মানুষ শেখে, নিজেকে বড় কিছুর জন্য উৎসর্গ করা যায়; ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে আদর্শের জন্য বেঁচে থাকা যায়।

এক সাহাবির ঘটনার মাধ্যমে এ শিক্ষা স্পষ্ট হয়। তিনি নির্জন গুহায় ইবাদতে জীবন কাটাতে চাইলেও আল্লাহর রাসুল (সা.) তাকে স্মরণ করিয়ে দেন, সহজ-সরল পথ দিয়ে তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছে; আল্লাহর পথে সামান্য সময় ব্যয় করাও গোটা দুনিয়ার চেয়ে উত্তম।

এতে বোঝা যায়, ইসলাম নিছক নির্জন উপাসনা নয়; বরং সক্রিয়, সামাজিক ও সংগ্রামী জীবনব্যবস্থা।

রোজা এমন এক ইবাদত, যা মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও সামষ্টিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এটি তাকওয়া সৃষ্টি করে, নৈতিকতা জাগ্রত করে, সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রেরণা দেয় এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ সুগম করে।

রমজান তাই কেবল না–খেয়ে থাকার মাস নয়; বরং আত্মগঠন, সমাজগঠন ও আল্লাহকেন্দ্রিক পূর্ণাঙ্গ জীবন প্রতিষ্ঠার মাস।

আহমাদ সাব্বির: আলেম ও লেখক

রোজা : কোরআন যেভাবে সংযমের শিক্ষা দেয়

Read full story at source