মূল্যবৃদ্ধির আশায় ডিজেলের কৃত্রিম সংকট, সাগরে যেতে পারছে না ট্রলার
· Prothom Alo

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার ফলে এর প্রভাব পড়েছে দেশের সমুদ্রগামী মৎস্য খাতে। ডিজেলের সংকটের কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রগামী হাজারো ট্রলার মাছ ধরতে সাগরে যেতে পারছে না। এতে এই অঞ্চলের কয়েক লাখ জেলে, ট্রলারমালিক ও মৎস্য খাতের ব্যবসায়ীরা বিপদে পড়েছেন।
ট্রলারমালিক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে ডিজেল সরবরাহ এখনো সংকুচিত না হলেও স্থানীয়ভাবে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ার সুযোগের অপেক্ষায় সরবরাহে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। এতে বরগুনা, পাথরঘাটা, পটুয়াখালীর আলীপুর, মহিপুর, ভোলার লালমোহন, মনপুরাসহ বিভিন্ন মৎস্যবন্দর ও অবতরণ কেন্দ্রে শত শত ট্রলার নোঙর করে জেলেরা অলস সময় কাটাচ্ছেন।
Visit sports24.club for more information.
বরগুনার পাথরঘাটায় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্যবন্দর ও বিএফডিসির মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র অবস্থিত। সেখানকার জেলে ও ট্রলারমালিকেরা বলেন, এখানে ৩০০টির বেশি মাছ ধরা ট্রলার ডিজেলের সংকটে সাগরে যেতে পারছে না। গত পাঁচ দিন অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে এসব ট্রলার সাগরে যেতে না পারায় বন্দরটির ব্যবসা-বাণিজ্যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। জ্বালানিসংকটের কারণে পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রসহ আশপাশের খাল ও নদীতে মাছধরা ট্রলারগুলো নোঙর করে অলস সময় কাটাচ্ছে। ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে ডিজেলসংকটে সাগরে যেতে না পেরে মৎস্যজীবী ও তাঁদের পরিবারের মাঝে হতাশা দেখা দিয়েছে।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মৎস্য ব্যবসায়ী মাসুম আকন বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার খবরে দেশে ডিজেলসহ জ্বালানি তেল নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এ সুযোগে পাথরঘাটার জ্বালানি ব্যবসায়ীরা সংকট সৃষ্টি করে তেল মজুত করছেন, এমন অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে গোপনে চড়া দামে তাঁরা তেল বিক্রি করছেন, তবে দু–একজন মৎস্য ব্যবসায়ী চড়া দামে ডিজেল কিনলেও বেশির ভাগ মৎস্য ব্যবসায়ীরা তাঁদের ট্রলার পাথরঘাটার বিভিন্ন খালে নোঙর করে রেখেছেন। এতে ঈদের আগমুহূর্তে ট্রলারমালিক ও জেলেদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে।
পাথরঘাটার চরদুয়ানীর মৎস্য ব্যবসায়ী জাকির বিশ্বাস বলেন, ‘দোকানে ডিজেল কিনতে গেলে ব্যবসায়ীরা বলছেন ডিজেল নেই। কিন্তু তাঁদের কাছেই আবার লিটারে ২০ টাকা করে বেশি দিলে গোপনে ডিজেল পাওয়া যায়। পরে আমি লিটারে ওই ২০ টাকা বাড়তি না দিয়ে পিরোজপুরের তুষখালী থেকে ডিজেল নিয়েছি।’
নাম–পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে পাথরঘাটা বিএফডিসি ঘাটে কথা হয় এক ট্রলার মাঝির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিবার বিএফডিসি এলাকার তেল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ট্রলারের ডিজেল নিই। কিন্তু আজ তিন দিন ধরে ঘাটে নোঙর করে আছি। ডিজেল দেবে দেবে বলেও ডিজেল পাচ্ছি না। পরে জানতে পারলাম বাড়তি দামে গোপনে দু-একটি ট্রলার ডিজেল নিয়ে যাচ্ছে।’
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, পাথরঘাটার অসাধু ব্যবসায়ীরা বাড়তি দামের আশায় তেল মজুত করে রেখেছেন। এতে সমুদ্রগামী মাছধরা ট্রলারগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পেয়ে ঘাটে অলস সময় কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতি উন্নতি সম্ভব নয়।
মাছেরখাল এলাকার একটি সমুদ্রগামী ট্রলারের জেলে জাফর হাওলাদার দুর্দশার কথা বর্ণনা করে বলেন, ‘সামনে ঈদ, পরিবারের সবাই চেয়ে আছে নতুন জামা-কাপড় এবং একবেলা ভালো খাবারের জন্য। কিন্তু এবার যে অবস্থা, তাতে ঈদের আনন্দ তো দূরে থাক, দুমুঠো ভাত তুলে দেওয়াই এখন দুষ্কর হয়ে পড়েছে। জানি না কী দিয়ে কী করব।’
জানতে চাইলে পাথরঘাটার জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ গাজী বলেন, ‘পাথরঘাটায় আমরা দুজন সরকারি ডিলার রয়েছি। কিন্তু আমাদের বাইরে অন্তত ৮ থেকে ১০ জন ব্যবসায়ী খুলনা ও বরিশাল থেকে অসাধু উপায়ে ও লাইসেন্সবিহীন জ্বালানি তেলের ব্যবসা করছেন, যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। মূলত তাঁরাই ইচ্ছামতো তেল বাজারে ছাড়েন আবার ইচ্ছামতো বাজারে বিক্রি করা বন্ধ রাখেন। এতে তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। যাতে আমাদের মতো সরকারি ডিলারের ওপরে চাপ পড়ে।’
এ ব্যাপারে বরগুনা জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার বলেন, যদি কোনো অসাধু ব্যবসায়ী জ্বালানি তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, তবে তাঁদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।