‘উইল টু ফাইট’: যুদ্ধে কেন ইরানই জয়ী হবে
· Prothom Alo
বিখ্যাত সামরিক তাত্ত্বিক কার্ল ফন ক্লজউইটজ বলেছিলেন, যুদ্ধ হলো মূলত ইচ্ছাশক্তির সংঘাত। আধুনিক রণক্ষেত্রে সামরিক শক্তি, উন্নত প্রযুক্তি, অস্ত্রের ঝনঝনানি কিংবা সৈন্যসংখ্যার আধিপত্য যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ঠিকই, তবে ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে শেষ পর্যন্ত বিজয় নির্ভর করে মানুষের মানসিক দৃঢ়তা ও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সংকল্পের ওপর। এ কারণেই বর্তমান সময়ের সামরিক গবেষণায় ‘উইল টু ফাইট’ বা লড়াই করার ইচ্ছাশক্তিকে যুদ্ধের অন্যতম প্রধান নির্ধারক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক র্যান্ড করপোরেশন ২০১৮ সালে ‘উইল টু ফাইট’–বিষয়ক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে আধুনিক প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অনেক সময় একটি সামরিক বাহিনীর লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। এ প্রবণতা শুধু যে যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তা নয়, বরং এটি ধীরে ধীরে পুরো সমাজ ও জাতির মানসিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করতে পারে।
যেসব জাতি নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করে, তাদের কাছে টিকে থাকাটাই একটি শক্তিশালী কৌশলগত অস্ত্র হয়ে ওঠে। যারা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করে লড়াই চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, শেষ পর্যন্ত বিজয়লক্ষ্মী তাদের দিকেই ঝুঁকে পড়ে।
র্যান্ডের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রযুক্তির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার ফলে যুদ্ধের মূল মানবিক স্বরূপ বা ‘হিউম্যান নেচার অব ওয়ারফেয়ার’ অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। যুদ্ধের মানসিক উপাদান বা ‘উইল টু ফাইট’-এর ওপর পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ায় আধুনিক সামরিক কাঠামোয় একধরনের অদৃশ্য দুর্বলতা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান যুগে প্রযুক্তির উৎকর্ষ যুদ্ধকে অনেকাংশে দূরবর্তী বা ‘রিমোট’ করে দিয়েছে। একজন ‘ড্রোন অপারেটর’ হাজার মাইল দূরে বসে একটি বোতাম টিপে নিখুঁত হামলা পরিচালনা করতে পারেন। এর ফলে যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা যেমন ভয়, ক্ষয়ক্ষতি, শারীরিক কষ্ট এবং মৃত্যুর ঝুঁকি সরাসরি অনুভব করার সুযোগ কমে যায়। এতে যুদ্ধের মানসিক প্রস্তুতি ও আত্মত্যাগের মনোভাব তুলনামূলকভাবে শিথিল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা। ‘জিপিএস জ্যামিং’, ‘সাইবার অ্যাটাক’ অথবা ‘ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার’ অনেক উন্নত প্রযুক্তিকেও মুহূর্তের মধ্যে অকার্যকর করে দিতে পারে। যদি এমন পরিস্থিতিতে সৈন্যদের মৌলিক যুদ্ধদক্ষতা ও মানসিক দৃঢ়তা পর্যাপ্ত না থাকে, তবে তাদের লড়াই করার ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পেতে পারে।
ইরান যুদ্ধে ক্লজউইটজ-তত্ত্ব: ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ঐতিহাসিক ভুলঅনেক সামরিক বিশ্লেষকের মতে, প্রযুক্তির এই আতিশয্য একটি সমাজ বা জাতির লড়াই করার মানসিকতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলা যেতে পারে। মার্কিন সমাজ অনেক সময় সামরিক অভিযানকে সমর্থন করলেও নিজেদের সৈন্যদের ক্ষয়ক্ষতি সহজে মেনে নিতে পারে না। সামান্য কিছু সৈন্যের মৃত্যুও সেখানে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে।
আধুনিক জনপ্রিয় সংস্কৃতিও এই অসংলগ্ন মানসিকতাকে উসকে দেয়। হলিউড চলচ্চিত্র, ভিডিও গেম এবং সুপারহিরো সংস্কৃতি যুদ্ধের একটি অবাস্তব চিত্র তুলে ধরে। ‘র্যাম্বো’, ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা’ কিংবা ‘সুপারম্যান’-এর মতো চরিত্রের মাধ্যমে যুদ্ধকে প্রায় অপরাজেয় নায়কের গল্প হিসেবে সাজানো হয়। কিন্তু বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিটি সৈনিকই রক্ত–মাংসের মানুষ এবং যুদ্ধের বাস্তবতা অত্যন্ত নির্মম।
বর্তমানে বিভিন্ন সংঘাতে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র বা আধুনিক শক্তিগুলো প্রধানত দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। অনেক ক্ষেত্রে পাইলটরা শত্রুপক্ষের আকাশসীমায় প্রবেশ না করেই হামলা সম্পন্ন করছেন। এ কৌশল প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এবং এতে সরাসরি সংঘর্ষের ঝুঁকি কম থাকে। তবে সমালোচকেরা মনে করেন, এটি যুদ্ধকে একধরনের ‘রিমোট ওয়ারফেয়ার’-এ পরিণত করছে, যেখানে মানবিক সংকল্পের চেয়ে যন্ত্রের প্রাধান্য বেশি।
অন্যদিকে সেনাবাহিনীতে যারা সরাসরি সম্মুখসমরে অংশ নেয়, বিশেষ করে পদাতিক ও সাঁজোয়া বাহিনী, তাদের সাধারণত ‘ফাইটিং আর্মস’ বলা হয়। তাদের মূল লক্ষ্য হলো শত্রুর সন্নিকটে গিয়ে তাকে পরাস্ত করা। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধকৌশলের বিবর্তনের ফলে সম্মুখসমরের অভিজ্ঞতা এবং মানসিক প্রস্তুতির গুরুত্ব দিন দিন কমে যাচ্ছে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।
যদি ‘উইল টু ফাইট’ তত্ত্বের আলোকে আমরা ইতিহাসের দিকে তাকাই, তবে কিছু অমোঘ সত্য সামনে আসে। কোরিয়ান যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ করা হলেও তাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়েনি। ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫০ লাখ টন বোমা ব্যবহার করেও শেষ পর্যন্ত ভিয়েতনামকে পরাজিত করতে পারেনি। এমনকি বর্তমান গাজা সংঘাতেও দেখা যাচ্ছে যে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সত্ত্বেও মানুষের লড়াই করার সংকল্প পুরোপুরি স্তব্ধ করা সম্ভব হয়নি।
এই উদাহরণগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে কেবল আধুনিক প্রযুক্তি বা আকাশচুম্বী বোমাবর্ষণের মাধ্যমে একটি জাতির প্রতিরোধক্ষমতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা সম্ভব নয়। যুদ্ধের ইতিহাস একটি মৌলিক সত্য বারবার প্রমাণ করেছে যে প্রযুক্তি যুদ্ধের ধরন বদলাতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের প্রকৃত স্বরূপ বদলাতে পারে না। যুদ্ধ এখনো শেষ পর্যন্ত মানুষের ইচ্ছাশক্তি, সহনশীলতা ও সংকল্পের লড়াই।
যেসব জাতি নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করে, তাদের কাছে টিকে থাকাটাই একটি শক্তিশালী কৌশলগত অস্ত্র হয়ে ওঠে। যারা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করে লড়াই চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, শেষ পর্যন্ত বিজয়লক্ষ্মী তাদের দিকেই ঝুঁকে পড়ে।
আধুনিক প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে যুদ্ধক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়েছে, কিন্তু প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যদি জাতির মানসিক দৃঢ়তাকে খর্ব করে দেয়, তবে সেটি দীর্ঘ মেয়াদে বড় ধরনের পরাজয়ের কারণ হতে পারে। কারণ, যুদ্ধের ময়দানে শেষ কথাটি অস্ত্র নয়, বরং মানুষের লড়াই করার অদম্য ইচ্ছাশক্তিই বলে থাকে।
তুষার কান্তি চাকমা সাবেক সামরিক কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার)
*মতামত লেখকের নিজস্ব