ইরানের সঙ্গে কিউবাকেও ধ্বংসে মেতেছেন ট্রাম্প

· Prothom Alo

ছোট্ট কিউবা, ফিদেল কাস্ত্রোর কিউবা, চে গুয়েভারার কিউবা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে বলা যায়। গলা টিপে ধরেছেন আমেরিকার ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলা ও ইরানে আগ্রাসনের ফাঁকে কিউবাকেও ধ্বংসে মেতেছেন তিনি। ইরানিদের মতোই কিউবানরাও আত্মসমর্পণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে লড়ছেন। মুখে তাঁদের একটাই কথা—‘মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ বেদখল হয়ে যাওয়ার পর কিউবার জন্য নিজেদের পছন্দসই সমাজব্যবস্থা নিয়ে টিকে থাকা দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। অবস্থা সামলাতে কিউবার সরকার বাস্তবসম্মত কিছু সংস্কারে হাত দিয়েছে এ মুহূর্তে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

বাংলাদেশেও লাল-জুলাইয়ে ‘মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ স্লোগানটি খুব শোনা যেত। তবে গণ–অভ্যুত্থানের পরের সরকার যেভাবে মাতৃভূমির অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপনে প্রশ্নবিদ্ধ চুক্তি করেছে, কিউবানরা সে রকম বিকল্প প্রত্যাখ্যান করে এসেছেন এত দিন; যার প্রতিশোধ হিসেবে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি সরবরাহে বাধা দিয়ে পুরো দেশটির বিদ্যুৎ সরবরাহ ১৬ ও ১৭ মার্চ ২৯ ঘণ্টার জন্য অচল করে দিয়েছিল ওয়াশিংটন।

ইরানের চেয়ে ভিন্ন কৌশল নেওয়া হয়েছে কিউবায়। ‘হাতে না মেরে ভাতে মারা’র চেষ্টা হচ্ছে দেশটির মানুষদের। অপরাধ তাঁদের একটাই—মাতৃভূমির জন্য তাঁরা সমাজতন্ত্রকে পছন্দ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছেমতো কোনো চুক্তি বা ব্যবস্থা মেনে নিতে চাইছেন না তাঁরা।

মাতৃভূমি রক্ষায় ফিদেল ও চের অনুসারীদের এসব নতুন নিরীক্ষার ফলাফল দেখতে নিশ্চিতভাবে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে ৬৬ বছর ধরে একটা স্লোগান কীভাবে কোনো জনগোষ্ঠীকে আত্মরক্ষায় নিরন্তর সৃজনশীল পথের সন্ধানে রাখে, তার অবিশ্বাস্য নজির কিউবা।

মাতৃভূমি বা মৃত্যু স্লোগানটির আদি সংস্করণ ছিল ‘স্বাধীনতা অথবা মৃত্যু’। কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলোর অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা রুখতে গিয়ে ফিদেল কাস্ত্রো নতুন রূপে স্লোগানটি দিতেন ‘মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ বলে। ১৯৬০ সালে প্রথম তিনি এ রকম স্লোগান দেন। সেই থেকে গত ৬৬ বছর এটা কিউবায় জনপ্রিয়। এর মধ্যে ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি কিউবার বিরুদ্ধে যে অবরোধ আরোপ করেন, এই লেখা তৈরির সময়ও সেটা চলছে। অবরোধের এই সিদ্ধান্তে প্রতিবছর নতুন নতুন ধারা যুক্ত করে কিউবার অর্থনীতির সব খাতকে এর অধীন নিয়ে আসা হয়েছে গত ৬৪ বছরে। অবরোধের মধ্যে আশপাশের যে দু–একটা দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কথা না শুনে কিউবাকে সাহায্য করত, তার মধ্যে ছিল ভেনেজুয়েলা। বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবা তার তেলের চাহিদার এক–তৃতীয়াংশ আনত।

তেলের বিনিময়ে কিউবার অনেক কর্মী সরকারি দায়িত্ব হিসেবে ভেনেজুয়েলায় কাজ করতেন। নিকোলা মাদুরোকে অপহরণের সময় সেখানে কর্মরত কিউবার ৩২ জন স্বেচ্ছাসেবককেও হত্যা করে আমেরিকার বাহিনী। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণের পেছনে কিউবায় তেল সরবরাহ একটা কারণ ছিল। তাঁকে তুলে নিয়ে কিউবাবিরোধী অবরোধকে আরও তীব্র করে তোলা হয়েছে।

কিউবায় ভেনেজুয়েলার তেল যাওয়া বন্ধের পাশাপাশি ট্রাম্প এ–ও ঘোষণা করেছেন, কিউবাকে যারা তেল দেবে, তাদের রপ্তানি পণ্যে ওয়াশিংটন বাড়তি শুল্ক আরোপ করবে। এই ঘোষণায় হাভানাকে দেওয়া মেক্সিকোর তেল সরবরাহও অঘোষিতভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। ট্রাম্প প্রশাসন এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে কিউবাকে বাধ্য করছে আপস করতে।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণের পেছনে কিউবায় তেল সরবরাহ একটা কারণ ছিল। তাঁকে তুলে নিয়ে কিউবাবিরোধী অবরোধকে আরও তীব্র করে তোলা হয়েছে।

কিউবার জ্বালানি চাহিদার ৪০ শতাংশ মেটায় মেক্সিকো। ভেনেজুয়েলা, মেক্সিকো ও ইরানের মতো বাণিজ্য সহযোগীদের হারিয়ে নাগরিকদের বাঁচাতে সংগত কারণেই কিউবার সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ ছাড়াও বহু বিষয়ে তীব্র সংকট চলছে দেশটিতে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের তরফ থেকে প্রায় প্রতিদিন কিউবাকে দখল করে নেওয়ারও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ রকম হুমকির বড় এক উদ্দেশ্য হাভানায় অস্থিতিশীলতা উসকে দেওয়া।

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তাঁদের কথা না শুনলে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেলকে ভেনেজুয়েলার মাদুরো কিংবা ইরানের খামেনির পরিণতি ভোগ করতে হবে।

১৯৫৯ সালের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর থেকে দীর্ঘ সময় ফিদেল কাস্ত্রো এই ছোট্ট দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০১৬ সালে তিনি মারা যান। মৃত্যুর বহু আগেই ভাই এবং সহযোদ্ধা রাউল কাস্ত্রোর হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। ২০২১ পর্যন্ত রাউল এবং তারপর মিগুয়েল দিয়াজ দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়াগুলো বরাবরই বলত, ফিদেল মারা যাওয়ামাত্র কিউবার সামাজিক মালিকানাভিত্তিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। বাস্তবে সে রকম কিছু হয়নি। তবে দক্ষিণ আমেরিকাজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্য বাড়া এবং ওই অঞ্চলের অনেকগুলো দেশে দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলো ভোটের রাজনীতিতে শক্তিশালী হয়ে ওঠার মুখে ছোট্ট কিউবায় পুঁজিতন্ত্রবিরোধী ভিন্ন এক সমাজব্যবস্থার টিকে থাকা দুরূহ হয়ে পড়েছে।

কিউবা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের আপত্তির বড় জায়গা তিনটি: দেশটি ওয়াশিংটনের কথামতো ভূমি বিদেশিদের কাছে কেনাবেচার জন্য উন্মুক্ত করছে না, পুরো অর্থনীতি বাজারের হাতে ছেড়ে দিচ্ছে না এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বহুদলীয় চরিত্র দিচ্ছে না। বলা বাহুল্য, কিউবার জনজীবনে প্রভাব বিস্তার করতে ওয়াশিংটনের এসব খুব প্রয়োজন।

কিউবার ভেতরকার অর্থনৈতিক সংকট এ মুহূর্তে অচিন্তনীয় এক স্তরে পৌঁছেছে। বাংলাদেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি থাকার পরও ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে—কেবল এই শঙ্কায় পাম্পস্টেশনগুলোয় বিশাল লাইন দেখছি আমরা। অন্যদিকে গত ডিসেম্বর থেকে কিউবার দিকে কোনো তেলবাহী জাহাজ যাচ্ছে না। কারও থেকে জ্বালানি কিনতে পারছে না তারা ওয়াশিংটনের অবরোধের কারণে।

এক কোটি মানুষের বিরুদ্ধে এই দস্যুতায় জাতিসংঘসহ সবাই উদাসীন। কিউবার বিরুদ্ধে প্রায় সাত দশক ধরে যে অবরোধ চালানো হচ্ছে, তার সপক্ষে জাতিসংঘেরও কোনো অনুমোদন বা সম্মতি নেই। সবই হচ্ছে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি অগ্রাহ্য করে।

জ্বালানির অভাবে হাভানার সড়কগুলোয় বহুদিন থেকে গাড়ি চলাচল কমে গেছে। পরিবহনসংকটে কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্য শহরাঞ্চলে আনতে পারছেন না। স্কুল ও হাসপাতালগুলো চালানো যাচ্ছে না। বিদ্যুতের অভাবে অপারেশন থিয়েটারগুলোয় কাজ করা যাচ্ছে না। ওষুধপথ্যের উৎপাদন ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। কেবল নিজেদের পছন্দসই অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা বাছাইয়ের কারণে ওয়াশিংটনের শাসকেরা এভাবে সাধারণ কিউবানদের সাজা দিচ্ছেন।

ইরানের মতো কিউবাতেও নিজেদের পছন্দসই সরকার বসাতে চাইছে ওয়াশিংটন। ইরানের পুরোনো রাজতন্ত্রপন্থীদের মতো কিউবার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনেক ভিন্নমতাবলম্বী ওয়াশিংটনে থাকেন। তাঁদের হাভানায় প্রভাবশালী করে তুলতে চান ট্রাম্প। সেই লক্ষ্যে কিউবার অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার বর্তমান ধরন বদলাতে প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেলকে চাপ দেওয়া হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পড়ে কিউবার সরকার এ মাসে অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তনও ঘটিয়েছে। নতুন নিয়মে প্রবাসী কিউবানরা এখন দেশে বেসরকারি কোম্পানি খুলে ব্যবসা করার সুযোগ পাবেন বলে জানানো হয়েছে। প্রবাসী কিউবানদের বৈদেশিক কোম্পানিগুলোও কিউবার ভেতরকার বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবে। রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের ধারণা, এই প্রক্রিয়ায় পরোক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে কিউবায় ব্যবসা করার একরূপ অনুমোদন দিচ্ছে হাভানার সরকার। এটা ২০২১ সালের সিদ্ধান্তের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। সে সময় কেবল দেশের ভেতরকার নাগরিকদের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান খোলায় অনুমতি দেওয়া হয়েছিল;যদিও আন্তর্জাতিক অবরোধে সেই সংস্কার প্রত্যাশামতো কাজ করেনি।

এবারের সিদ্ধান্তকে অনেকে কিউবায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বড় ধরনের মোড়বদল হিসেবে দেখছেন। নিজ দেশের জনগণকে বাঁচাতে দেশটির শাসকদের সামনে আপাতত এ ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না বলেই মনে হচ্ছে। তবে কিউবার সরকার দেশটিতে সোলারসহ বিকল্প পদ্ধতিতে জ্বালানি স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য দ্রুতলয়ে অনেক পদক্ষেপ নিচ্ছে। চীন তাদের হাজার হাজার সোলার প্যানেল দিয়ে এ কাজে সহায়তা দিচ্ছে। এ বছর কিউবার জ্বালানির ৬ শতাংশ সৌরশক্তির উৎস থেকে আসছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে এটা ২০ শতাংশে উন্নীত করতে চলেছে তারা। ২০৫০ সালের মধ্যে আমদানি করা খনিজ তেলের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কমিয়ে ফেলতে চায় কিউবা।

মাতৃভূমি রক্ষায় ফিদেল ও চের অনুসারীদের এসব নতুন নিরীক্ষার ফলাফল দেখতে নিশ্চিতভাবে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে ৬৬ বছর ধরে একটা স্লোগান কীভাবে কোনো জনগোষ্ঠীকে আত্মরক্ষায় নিরন্তর সৃজনশীল পথের সন্ধানে রাখে, তার অবিশ্বাস্য নজির কিউবা।

  • আলতাফ পারভেজ  ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

  • মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source