ওসাকার রাত, ট্রেনের শব্দ আর এক প্রবাসী মন
· Prothom Alo
জীবনে প্রথমবার এত দূরে আসা। দেশের আকাশ, মানুষের কোলাহল, পরিচিত রাস্তা—সবকিছু পেছনে ফেলে আমি এখন জাপানে। ট্রেনিংয়ের অংশ হিসেবে এসেছি ওসাকায়। শহরটা যেন এক অদ্ভুত মিশ্রণ—অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আর নিখুঁত শৃঙ্খলার সঙ্গে মানুষের নীরব জীবনযাপন।
আমি থাকি আবিকো এলাকায়। সকালবেলা ঘুম ভাঙে অদ্ভুত এক নীরবতায়। আমাদের দেশের মতো হর্ন, চিৎকার, হইচই নেই। কিন্তু এই নীরবতার মধ্যেও একটা ছন্দ আছে—স্টেশনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় যেন পুরো শহরটা একটা অদৃশ্য ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
স্টেশনে ঢুকলেই সেই ছন্দটা চোখে পড়ে। জাপানের ট্রেনগুলো যেন সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চলে। ট্রেন আসবে ঠিক যে সময়ে লেখা আছে, সেকেন্ডের এদিক-ওদিকও হবে না। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকলে দেখা যায়—মানুষ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ ধাক্কাধাক্কি করছে না, কেউ অস্থির নয়।
আমি প্রথম যেদিন উমেদা স্টেশনে গিয়েছিলাম, মনে হয়েছিল যেন একটা শহরের ভেতরে আরেকটা শহর। বিশাল সেই স্টেশন—শত শত মানুষ চলাফেরা করছে, কিন্তু তবুও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। কাচের দেয়াল, আলোঝলমলে দোকান, আর নিচে-ওপরে ছুটে চলা ট্রেনের লাইন।
আর নাম্বা স্টেশন—ওটা যেন একেবারে অন্য রকম। শহরের প্রাণকেন্দ্র বলা যায়। এখানে নামলেই মনে হয় শহরটা যেন আরও দ্রুত বেঁচে আছে। চারপাশে মানুষ, আলো আর একধরনের উদ্দাম গতি।
আমি প্রথম যেদিন উমেদা স্টেশনে গিয়েছিলাম, মনে হয়েছিল যেন একটা শহরের ভেতরে আরেকটা শহর। বিশাল সেই স্টেশন—শত শত মানুষ চলাফেরা করছে, কিন্তু তবু কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। কাচের দেয়াল, আলো ঝলমলে দোকান, আর নিচে-ওপরে ছুটে চলা ট্রেনের লাইন।
জাপানে এসে প্রথমবার বুলেট ট্রেন দেখার অভিজ্ঞতাটা এখনো মনে পড়ে। দূর থেকে দেখতে মনে হয় যেন কোনো সাদা রঙের তির ছুটে যাচ্ছে। কাছে গেলে বোঝা যায়—এটা শুধু একটা ট্রেন নয়, প্রযুক্তির এক বিস্ময়। নিঃশব্দে, মসৃণভাবে এমন গতিতে ছুটে চলে যে মনে হয় সময়কে পেছনে ফেলে দিচ্ছে।
কিন্তু দিনের ওসাকা আর রাতের ওসাকা এক নয়।
রাত নামলে শহরটা যেন অন্য এক জগতে রূপ নেয়। এক সন্ধ্যায় আমি গেলাম ডোটনবরি এলাকায়। নদীর পাশে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকাতেই মনে হলো যেন রঙিন আলোর সমুদ্রে দাঁড়িয়ে আছি। বিশাল নিয়ন সাইনবোর্ড, চলন্ত বিলবোর্ড, আর নদীর পানিতে প্রতিফলিত আলো—সব মিলিয়ে যেন সিনেমার দৃশ্য।
ডোটনবরির রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে নানা ধরনের খাবারের গন্ধ ভেসে আসে। কোথাও গরম–গরম তাকোইয়াকি বানানো হচ্ছে, কোথাও আবার ওকোনোমিয়াকি। ছোট ছোট দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ খাবার খাচ্ছে, হাসছে, ছবি তুলছে।
আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম সেই বিখ্যাত গ্লিকো সাইনবোর্ডের সামনে। চারপাশে হাজার হাজার মানুষ। কেউ পর্যটক, কেউ স্থানীয়। কিন্তু সবার চোখে এক ধরনের আনন্দ।
সেই মুহূর্তে হঠাৎ মনে হলো—পৃথিবীটা আসলে কত বড়, আর আমরা মানুষ কত ছোট ছোট গল্প নিয়ে বেঁচে আছি।
একদিকে প্রযুক্তির দৌড়ে ছুটে চলা জাপান, আর অন্যদিকে আমার মনটা হঠাৎ চলে যায় হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশে। মনে পড়ে গ্রামের রাস্তা, চায়ের দোকানের আড্ডা, আর পরিচিত মানুষের মুখ।
ডোটনবরির ঝলমলে আলোয় দাঁড়িয়ে তখন মনে হচ্ছিল—প্রবাস মানে শুধু দূরত্ব নয়। প্রবাস মানে নিজের ভেতরে একটা নীরব টান, যা বারবার আপন মাটির দিকে ফিরে যেতে চায়।
রাত বাড়ছিল। নদীর ওপর আলো ঝিলমিল করছিল, মানুষ তখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে। দূরে কোথাও আবার ট্রেনের শব্দ।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আমি ভাবছিলাম—এই শহর আমাকে হয়তো অনেক কিছু শেখাবে। শৃঙ্খলা, সময়ের মূল্য, আর স্বপ্নকে বড় করে দেখার সাহস।
কিন্তু দিনের শেষে, যত দূরেই যাই না কেন—মনের ভেতর একটা ছোট্ট জায়গায় বাংলাদেশ সব সময়ই রয়ে যায়।
হয়তো এটাই প্রবাসজীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।