ভাঙচুরের দেড় বছর পরও সংস্কার হয়নি বরিশালের বধ্যভূমি ও টর্চার সেল

· Prothom Alo

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বরিশালের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি ও পাকিস্তানি বাহিনীর টর্চার সেল কমপ্লেক্সের নানা অবকাঠামো ভাঙচুর করা হয়। এর পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাটি সংস্কারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে ঐতিহাসিক এই স্থাপনা।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের অর্থায়নে দেড় একর জমির ওপর সংরক্ষণ করা হয়েছে নির্যাতন ক্যাম্প, বাংকার, বধ্যভূমি ও সেতু। শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সেতুর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে ‘স্মৃতিস্তম্ভ ৭১’। ২০২০ সালের ৮ ডিসেম্বর এই বধ্যভূমি ও টর্চার সেল সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল।

Visit h-doctor.club for more information.

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গানবোট ও হেলিকপ্টারে বরিশালে ঢুকে ওয়াপদা কলোনি দখল করে নেয়। সেখানে সেনা ক্যাম্প ও টর্চার সেল স্থাপন করে তারা। কীর্তনখোলার তীরবর্তী এই ক্যাম্প থেকে ঝালকাঠি, পটুয়াখালী ও ভোলায় অপারেশন চালানো হতো। টর্চার সেলে বন্দী মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে খুন করে লাশ কীর্তনখোলাসংলগ্ন সাগরদী খালের তীরে ফেলা হতো। কীর্তনখোলার তীরবর্তী ত্রিশ গোডাউন কম্পাউন্ডের এলাকা থেকে নদীর ঘাট পর্যন্ত ধানের জমির পুরো এলাকা ছিল বরিশালের মূল গণকবর ও বধ্যভূমি।

স্বাধীনতার পর এলাকাটি রাষ্ট্রীয়ভাবে বধ্যভূমি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পরে ওয়াপদা কলোনি ও কীর্তনখোলা খালের তীরবর্তী প্রায় দেড় একর জায়গাজুড়ে বধ্যভূমি ও টর্চার সেল সংরক্ষণ প্রকল্প শুরু হয়। প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। উদ্বোধনের পর প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত স্মৃতিসৌধ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল।

কীর্তনখোলার তীরবর্তী ত্রিশ গোডাউন কম্পাউন্ডের এলাকা থেকে নদীর ঘাট পর্যন্ত ধানের জমির পুরো এলাকা ছিল বরিশালের মূল গণকবর ও বধ্যভূমি। স্বাধীনতার পর এলাকাটি রাষ্ট্রীয়ভাবে বধ্যভূমি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পরে ওয়াপদা কলোনি ও কীর্তনখোলা খালের তীরবর্তী প্রায় দেড় একর জায়গাজুড়ে বধ্যভূমি ও টর্চার সেল সংরক্ষণ প্রকল্প শুরু হয়।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বধ্যভূমি কমপ্লেক্সে প্রবেশ করলে একসময় দর্শনার্থীদের গা শিউরে উঠত। দুটি টর্চার সেলের ভেতরে স্থাপিত সাউন্ড সিস্টেমে শোনা যেত নারী-পুরুষের আর্তনাদ। মূলত নির্যাতনের আবহ সৃষ্টির জন্যই এমন শব্দের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এ ছাড়া পুরো কমপ্লেক্সে মৃদু স্বরে বাজত মুক্তিযুদ্ধের গান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলে একদল লোক বধ্যভূমি কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। লুট করে নিয়ে যায় সাউন্ড সিস্টেম, লাইটসহ গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম।

সম্প্রতি বধ্যভূমি কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, দর্শনার্থীরা আগের মতো সহজে ঢুকতে পারেন না। মূল সড়ক থেকে খালপাড় ঘেঁষে সিটি করপোরেশন একটি ওয়াকওয়ে নির্মাণ করলেও তা এখনো অসম্পূর্ণ। ফলে কয়েক ফুট নিচে লাফিয়ে নেমে বধ্যভূমিতে ঢুকতে হয়।

এক নিরাপত্তাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনার পর সেপ্টেম্বরের এক গভীর রাতে একদল লোক গিয়ে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে মারধর করে। একপর্যায়ে তারা ভেতরে ঢুকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটূক্তি করে দেয়ালে বিভিন্ন শব্দ লেখে। পরে অবশ্য লেখাগুলো মুছে ফেলা হয়েছে।

দর্শনার্থীরা আগের মতো সহজে বধ্যভূমি কমপ্লেক্সে ঢুকতে পারেন না

বরিশালের বীর মুক্তিযোদ্ধা এ এম জি কবীর ভুলু বরিশাল নগরের ওয়াপদা কলোনিতে পাকিস্তানি সেনাদের টর্চার সেল থেকে বেঁচে ফেরা একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে ওই টর্চার সেলেই তিনি ১৯ দিন পাকিস্তানি সেনাদের অকথ্য নির্যাতনের শিকার হন। পরে আরও ৭১ দিন কারাগারে বন্দী ছিলেন। মুক্তি পাওয়ার পর আবারও রণাঙ্গনে ফিরে যান এই লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা।

সম্প্রতি প্রথম আলোকে এ এম জি কবীর ভুলু বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থাপনায় হামলার ঘটনা তাঁকে অত্যন্ত ব্যথিত করেছে। তাঁর মতে, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম রাজনৈতিক মতভেদের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত। কিন্তু দেড় বছর ধরে একটি মহল এসব স্থাপনাকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড় বধ্যভূমি ও পাকিস্তানি বাহিনীর টর্চার সেল কমপ্লেক্সের স্মৃতিস্তম্ভসহ অন্যান্য অবকাঠামো সংস্কার করে এটির মর্যাদা রক্ষায় প্রশাসনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

এই বধ্যভূমি ও টর্চার সেল সংরক্ষণ প্রকল্পে বরিশাল সিটি করপোরেশনকে সহযোগিতা করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বিশ্ববিদ্যালয় অব এশিয়া প্যাসিফিক, বরিশাল মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদ।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বধ্যভূমি ও স্মৃতি কমপ্লেক্সটির সংস্কারের ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছি; কিন্তু সিটি করপোরেশনের তহবিল–সংকটের কারণে এ উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি। বিষয়টি বিবেচনায় আছে। অর্থের সংস্থান হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটির সংস্কারকাজ করা হবে।’

Read full story at source