সুয়েজ ছিল ব্রিটিশের মৃত্যুঘণ্টা, হরমুজ কি আমেরিকার জন্য তা–ই?

· Prothom Alo

সাম্রাজ্য হঠাৎ করে ভাঙে না, ধীরে ধীরে ভাঙে। যখন সামরিক বিস্তার রাজনৈতিক কৌশলকে ছাপিয়ে যায়, যখন অর্থনীতির ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ে, আর যাদের দমিয়ে রাখতে চাওয়া হয়, তারা যখন সময়ের অপেক্ষায় টিকে থাকে, তখনই দমনকারী শক্তির পতনের সূচনা হয়।

Visit grenadier.co.za for more information.

১৯৫৬ সালে সুয়েজ খালের জাতীয়করণ ছিল তেমনই এক সন্ধিক্ষণ, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছিল। এই সংকট ব্রিটেনের আর্থিক দুর্বলতাকে নগ্ন করে দিয়েছিল। মার্কিন চাপের মুখে পাউন্ড স্টার্লিংয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে তার অবস্থান দ্রুত ক্ষয়ে গিয়েছিল। আর শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদী হাত গুটিয়ে আনা অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

সাত দশক পরে হরমুজ প্রণালি ঘিরে যে সংঘাত তীব্রতর হচ্ছে, তা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ক্ষমতার জন্য তেমনই এক মোড় ঘোরানো মুহূর্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই তুলনা নিছক আলংকারিক অর্থে নয়, বাস্তবের গভীরে তার সাযুজ্য রয়েছে।

দুটি ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত এক সাম্রাজ্যিক শক্তির মুখোমুখি হয়েছে এমন এক আঞ্চলিক শক্তি, যে আত্মসমর্পণে রাজি নয়। নিজের প্রভাব বজায় রাখতে সাম্রাজ্য নির্ভর করেছে সামরিক শক্তির ওপর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফল শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্যে নির্ধারিত হয়নি, বরং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং বিশ্বশক্তির ভারসাম্যের পরিবর্তনে তা নির্ধারিত হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে যে গোপন এজেন্ডা ইসরায়েলের

সুয়েজ, ১৯৫৬

১৯৫৬ সালের জুলাইয়ে মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের যখন সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন, তখন তিনি কেবল মিসরের সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করেননি, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক শক্তির ভিতকেই চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।

এই খাল শুধু বাণিজ্যপথ ছিল না; এটি ছিল ব্রিটেনের অবশিষ্ট উপনিবেশগুলোর সঙ্গে সংযোগ রক্ষার কৌশলগত ধমনি। একই সঙ্গে এটি ছিল সাম্রাজ্যিক মর্যাদার প্রতীক।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ক্লান্ত ব্রিটেন একপর্যায়ে ফ্রান্স ও ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে মিসরের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। লক্ষ্য ছিল—সুয়েজের জাতীয়করণ প্রত্যাহার, নাসেরকে ফেলে দেওয়া এবং সাম্রাজ্যিক নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা। সামরিক দিক থেকে প্রথম দিকে সাফল্য এসেছিল। অ্যাংলো-ফরাসি বাহিনী দ্রুত অগ্রসর হয়েছিল এবং তাদের সহায়তা নিয়ে ইসরায়েল সিনাই দখল করেছিল। কিন্তু এই সাফল্য রাজনৈতিক বিজয়ে রূপ নেয়নি।

সেখানে নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়েছিল অন্য শক্তি। মিসরের প্রতিরোধ যেমন ছিল, তেমনি ছিল দুই পরাশক্তি। তারা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। তখন দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি ছিল এই দুই শক্তি।

ইরান যুদ্ধ যেভাবে শেষ হতে পারে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ার পরিস্থিতির ঝুঁকি যেমন বুঝেছিলেন, তেমনি ব্রিটেনকে প্রান্তে সরিয়ে দেওয়ার সুযোগও দেখেছিলেন। তিনি স্পষ্ট আলটিমেটাম দিয়েছিলেন।

সে সময় ওয়াশিংটন আর্থিক প্রতিশোধের হুমকি দেয়—পাউন্ড স্টার্লিংয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সহায়তা সীমিত করার পথ বেছে নেয়। ব্রিটেন আমদানি খরচ সামলাতে এবং নিজের মুদ্রার মান ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছিল। এর ফলে এই চাপ তাদের জন্য হয়ে ওঠে চূড়ান্ত আঘাত।

ব্রিটেনকে অপমানজনকভাবে পিছু হটতে হয়। অভিযান ভেস্তে যায়। আর নাসের রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন।

এই সংকট মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটেনের আধিপত্যের শেষ সিলমোহর হয়ে দাঁড়ায়। তার জায়গায় আমেরিকা নতুন আঞ্চলিক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে উঠে আসে। লন্ডন বুঝে যায়, ওয়াশিংটনের সম্মতি ছাড়া আর কোনো কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়। মিত্র ও প্রতিপক্ষ—সবাই ব্রিটিশ শক্তিকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করে।

সুয়েজ সংকট আমাদের শেখায়—শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে সাম্রাজ্য টিকে থাকে না। যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে থেকেও অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং কৌশলগত অতিরিক্ত বিস্তার শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরাজয় ডেকে আনতে পারে।

ব্রিটেন তখন, আমেরিকা এখন

১৯৫৬ সালের ব্রিটিশ সাম্রাজ্য হোক বা আজকের যুক্তরাষ্ট্র—দুই ক্ষেত্রেই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর তুলনায় সামরিক ক্ষমতা ছিল বিপুল। তবু উভয়কেই আটকে দিয়েছিল গভীরতর কাঠামোগত দুর্বলতা।

অর্থনৈতিক দিক থেকে যুদ্ধপরবর্তী ব্রিটেন ছিল ঋণের ভারে জর্জর। ১৯৫৬ নাগাদ তার ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২৭ বিলিয়ন পাউন্ডে (আজকের হিসাবে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার)। সঙ্গে ছিল শিল্প প্রতিযোগিতার অবনতি এবং বাইরের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা।

আজকের আমেরিকার অবস্থাও অস্বস্তিকরভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। আমেরিকার জাতীয় ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, বাজেট–ঘাটতি স্থায়ী রূপ নিয়েছে, আর ডলার-ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে।

এর ফলে ওয়াশিংটনের সাম্রাজ্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ক্রমে একটি দুর্বল অর্থনীতির কাছে বন্দী হয়ে পড়ছে।

সুয়েজ সংকট যেমন ব্রিটিশ পতনের সূচক ছিল, তেমনি সেটিই আবার আমেরিকার উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছিল। আইজেনহাওয়ারের হস্তক্ষেপ নিছক ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরোধিতা ছিল না; বরং সেটি ছিল এক হিসাবি কৌশল। তাঁর লক্ষ্য ছিল ইউরোপীয় মিত্রদের স্বতন্ত্র পদক্ষেপ ঠেকানো এবং নিজেকে অঞ্চলের অপরিহার্য শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

ব্রিটেনের মতোই আমেরিকার সামরিক বিস্তার আজ বিশ্বজুড়ে—পূর্ব ইউরোপ থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক পর্যন্ত। কিন্তু এই বিস্তার তাকে দুর্বলও করে তুলেছে। একসময় যে মধ্যপ্রাচ্য ছিল মার্কিন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু, এখন তা বহু ক্ষেত্রে বোঝা হয়ে উঠেছে। এর ফলে আমেরিকার শক্তি থাকলেও সেই শক্তিকে নির্ণায়ক ফলাফলে রূপ দেওয়ার ক্ষমতা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে উঠছে।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও স্পষ্ট মিল পাওয়া যাচ্ছে। ব্রিটেন যেমন জাতীয়তাবাদী উত্থানকে ভুলভাবে বিচার করেছিল এবং নিজের প্রভাব আরোপের ক্ষমতাকে অতিমূল্যায়ন করেছিল, আজ আমেরিকাও তেমন এক অঞ্চলের মুখোমুখি, যেখানে দশকের পর দশক সংঘাতের ফলে অরাষ্ট্রীয় শক্তি, আঞ্চলিক শক্তি ও আন্তরাষ্ট্রীয় নেটওয়ার্কগুলো ঐতিহ্যগত নিয়ন্ত্রণকাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে।

সুয়েজ সংকট যেমন ব্রিটিশ পতনের সূচক ছিল, তেমনি সেটিই আবার আমেরিকার উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছিল। আইজেনহাওয়ারের হস্তক্ষেপ নিছক ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরোধিতা ছিল না; বরং সেটি ছিল এক হিসাবি কৌশল। তাঁর লক্ষ্য ছিল ইউরোপীয় মিত্রদের স্বতন্ত্র পদক্ষেপ ঠেকানো এবং নিজেকে অঞ্চলের অপরিহার্য শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

আমেরিকাকে আবারও হারিয়ে দিতে যাচ্ছেন ট্রাম্প...

ব্রিটেনের প্রভাববলয়কে উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ করে ওয়াশিংটন দ্রুত নিজের প্রভাব বিস্তার করেছিল। ওয়াশিংটন সামরিক ঘাঁটির সম্প্রসারণ করেছিল, জোট সুসংহত করেছিল এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ জোরদার করেছিল। এর মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান বহিঃশক্তি হয়ে উঠেছিল আমেরিকা।

সামরিক ঘাঁটির জাল, অস্ত্র বিক্রি, তেল-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ, পেট্রোডলার ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সর্বোপরি উপসাগরীয় ধনী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলে ওয়াশিংটন নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে মিসর, জর্ডান, মরক্কোসহ গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোকে অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে, তাদের ওপর ঋণের চাপ সৃষ্টি করে, গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়িয়ে এবং স্বৈরশাসনকে সমর্থনের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাববলয়ে নিয়ে আসে।

অন্যদিকে যে দেশগুলো একসময় আরব জাতীয়তাবাদী ব্লকের অংশ ছিল (যেমন ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও লিবিয়া) সেখানে মার্কিন নীতি ভাঙন ও অস্থিরতাকে উৎসাহিত করেছে। এর ফলে তৈরি হয়েছে দুর্বল রাষ্ট্র। এতে তারা আমেরিকার আধিপত্য বা ইসরায়েলকেন্দ্রিক নীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারেনি।

হরমুজের মোড়

বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই সম্পন্ন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এই পথের সামান্য বিঘ্নও বিশ্ব অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক এবং সুদূরপ্রসারী অভিঘাত ডেকে আনতে পারে।

এই পথকে নিয়ন্ত্রণ বা বিপর্যস্ত করার সক্ষমতা ইরানের হাতে এসেছে তার ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক শক্তি, অসম যুদ্ধকৌশল এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তার কারণে।
১৯৫৬ সালে মিসর মূলত কূটনীতি আর আন্তর্জাতিক রাজনীতির খেলায় ভরসা করেছিল। বিশেষ করে তখনকার দুই বড় শক্তির টানাপোড়েনকে কাজে লাগিয়ে মিসর সাহস দেখিয়েছিল।

কিন্তু আজকের ইরান শুধু কথাবার্তা বা কূটনীতির ওপর নির্ভর করছে না। তাদের হাতে আছে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং চাইলে বিশ্বের তেল-গ্যাস সরবরাহেও আঘাত করার ক্ষমতা।

ইরান যুদ্ধে ক্লজউইটজ-তত্ত্ব: ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ঐতিহাসিক ভুল

তাই এখন মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই মনে করছে, এই অঞ্চলের অস্থিরতার পেছনে ‘আমেরিকা-জায়নবাদী অক্ষ’-এর যুদ্ধনীতির বড় ভূমিকা রয়েছে।

ইরান এই সংঘাতের ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে। তাদের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের অবসান, যুদ্ধের দায় স্বীকার, ভবিষ্যৎ হামলার বিরুদ্ধে নিশ্চয়তা, অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি বন্ধ, ক্ষতিপূরণ প্রদান ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর একটি নতুন কাঠামো প্রতিষ্ঠার কথাও বলা হয়েছে, যেখানে ইরানের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রতিফলিত হবে। একই সঙ্গে আছে বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের দাবি। আছে গাজা উপত্যকা, লেবানন, ইয়েমেন ও সিরিয়ার যুদ্ধের অবসান এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের পারমাণবিক একচেটিয়া অবস্থান নিয়ে একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষ করে যখন গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ তৃতীয় বছরে প্রবেশ করেছে এবং বারবার ‘লাল দাগ’ অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক আইন ও বিধিনিষেধকে অগ্রাহ্য করে তারা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেছে, তখন ইসরায়েলকে ঠেকানোর বিষয়টি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৌশলগত সাফল্যের জন্য ইরানের সব লক্ষ্য পূরণ অপরিহার্য নয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানকে আত্মসমর্পণ করাতে ব্যর্থ হয়, যদি তারা ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে না পারে, কিংবা তাকে চূড়ান্তভাবে দুর্বল করতে না পারে—তাহলেই ইরানের মূল লক্ষ্য, অর্থাৎ টিকে থাকা অর্জিত হয়ে যায়।

আমেরিকার সীমা

এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র এক জটিল দোটানা পরিস্থিতিতে পড়েছে। এটিকে অনেকটা ১৯৫৬ সালের ব্রিটেনের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, যদিও আজকের প্রেক্ষাপট আরও জটিল।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সংঘাত বাড়ানো মানে বিপুল ঝুঁকি। হরমুজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে বা জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি অস্থির হয়ে উঠবে, জ্বালানির দাম বাড়বে, আর চাপ বাড়বে মার্কিন মিত্রদের ওপর।

আবার লক্ষ্য পূরণ না করেই যদি উত্তেজনা প্রশমনের পথে হাঁটা হয়, তবে তা মার্কিন ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই প্রকাশ্যে এনে দেবে। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে বার্তা যাবে—সহ্যশক্তি দিয়েই সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তিকেও পরাস্ত করা যায়।
এই উভয়সংকটই সাম্রাজ্যিক ‘অতিরিক্ত বিস্তার’-এর মূল সমস্যা।

এই সংঘাত বিশ্লেষণে কৌশলগত (ট্যাকটিক্যাল) ও কাঠামোগত (স্ট্রাকচারাল) শক্তির মধ্যকার একটি পার্থক্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

‘আমেরিকা-জায়নবাদী অক্ষ’-এর কাছে রয়েছে স্পষ্ট সামরিক সুবিধা। তাদের কাছে বিমানশক্তি, নৌক্ষমতা, গোয়েন্দা পরিকাঠামো ও প্রযুক্তিগত আধিপত্য—সব আছে। কিন্তু এই শক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব সময় রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ নেয় না।

অন্যদিকে ইরান দাঁড়িয়ে আছে কাঠামোগত স্থিতিস্থাপকতার ওপর। তার ভৌগোলিক বিস্তৃতি, বিকেন্দ্রীভূত সামরিক কৌশল এবং আঞ্চলিক মৈত্রী তাকে দীর্ঘমেয়াদি চাপ সহ্য করতে ও পাল্টা জবাব দিতে সক্ষম করে। তার চেয়েও বড় কথা—তার লক্ষ্য সীমিত ও অর্জনযোগ্য।

এই অসমতাই শেষ পর্যন্ত নির্ণায়ক। একদিকে আমেরিকা-জায়নবাদী অক্ষ চায় ইরানের রাষ্ট্রকাঠামো ও আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে বদলে দিতে; অন্যদিকে ইরানের লক্ষ্য টিকে থাকা এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ইতিহাস বলে, এমন অসম লড়াইয়ে সাধারণত সীমিত লক্ষ্য নিয়ে যে পক্ষ লড়ে, তার জয়ের সম্ভাবনাই বেশি।

এক যুগের অবসান

আমেরিকার আধিপত্য দুর্বল হলে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বায়ত্তশাসনের ক্ষেত্র বাড়বে। পাশাপাশি চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিগুলোর উপস্থিতিও বাড়বে—যদিও তারা হয়তো একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে না।

আঞ্চলিক স্তরে ইরানের টিকে থাকা ও শক্তিশালী হওয়া ক্ষমতার ভারসাম্যকে বদলে দেবে। ইসরায়েলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক আধিপত্যের ধারণা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এতে মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নতুন করে খতিয়ে দেখা হবে এবং নতুন জোট গড়ে উঠতে পারে। এই পটভূমিতে ফিলিস্তিন প্রশ্ন আবারও কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে গেলে ইসরায়েলের শক্তিও কমতে শুরু করবে। কারণ, ইসরায়েলের বড় শক্তি হলো আমেরিকার পূর্ণ সমর্থন। সেই সমর্থন যখন দুর্বল বা ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে, তখন ইসরায়েলের ভিত্তিও ধীরে ধীরে নড়বড়ে হচ্ছে।
এটা হঠাৎ ভেঙে পড়া নয়—বরং আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে যাওয়া। এতে তার সামরিক ক্ষমতা কমবে, আন্তর্জাতিকভাবে সে আরও একঘরে হয়ে পড়বে, আর ভেতরের সমস্যা বাড়বে।

ইরান যুদ্ধ, নাকি দাজ্জালতত্ত্বে মোড়া ‘আমেরিকান ক্রুসেড’!

ইতিহাসে দেখা গেছে, যেসব রাষ্ট্র বাইরের শক্তির ভরসায় টিকে থাকে, সেই সমর্থন সরে গেলে তারা বেশি দিন টেকে না। তাই এখানে প্রশ্নটা ‘হবে কি না’ নয়, বরং ‘কখন হবে’।
যেমন সুয়েজ সংকট ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের ইঙ্গিত দিয়েছিল, তেমনি হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি হয়তো দেখাচ্ছে—এবার পুরো সাম্রাজ্যিক আধিপত্যই ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের শিক্ষা একটাই—সাম্রাজ্য ভাঙে এক দিনে নয়, এক যুদ্ধে নয়; ভাঙে তখনই, যখন তারা আর শক্তিকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে রূপান্তর করতে পারে না। সেই অর্থে এই সংঘাতের পরিণতি হয়তো ইতিমধ্যেই নির্ধারিত হয়ে গেছে।

  • সামি আল-আরিয়ান ফিলিস্তিনি লেখক এবং ইস্তাম্বুল জায়িম ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক।
    মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

Read full story at source