খাবার থেকে ফ্যাশন: বিশ্বজুড়ে জিরো ওয়েস্ট এখন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
· Prothom Alo

মানুষের তৈরি সভ্যতা বর্জ্যে ভরে যাচ্ছে। এই সংকট থেকেই জন্ম নিচ্ছে এক নতুন লাইফস্টাইল আন্দোলন ''জিরো ওয়েস্ট লিভিং'। খাবার, পোশাক, এমনকি জুয়েলারি, সবখানেই এখন দেখা যাচ্ছে সচেতনতার এই পরিবর্তন।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যগুলোর একটি হলো প্রকৃতিতে কোনো বর্জ্য নেই, অথচ মানুষের তৈরি সভ্যতা বর্জ্যে ভরে যাচ্ছে। এই সংকট থেকেই জন্ম নিচ্ছে এক নতুন লাইফস্টাইল আন্দোলন ''জিরো ওয়েস্ট লিভিং''। খাবার, পোশাক, এমনকি জুয়েলারি, সবখানেই এখন দেখা যাচ্ছে সচেতনতার এই পরিবর্তন।৩০শে মার্চ সারাবিশ্বে পালিত হয় ওয়ার্ল্ড জিরো ওয়েস্ট ডে। ফ্যাশন থেকে শুরু করে খাবারে এই জিরো ওয়েস্টের নানা উদ্যোগের গল্প জেনে নিই চলুন।
Visit moryak.biz for more information.
জিরো ওয়েস্ট রেস্তোরাঁ সিলো
লন্ডনের সিলো শুধু একটি খাবারের জায়গা নয় এটি পৃথিবীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ জিরো ওয়েস্ট রেস্তোরাঁ। ২০১১ সালে অস্ট্রেলিয়ার শিল্পী জোস্ট বাক্কার ‘বিন ছাড়া রান্না’ ধারণা প্রকাশের পর, শেফ ও মালিক ডগলাস এটিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। এখানে খাবারের প্রতিটি অংশ ব্যবহার হয় সবজির খোসা, আঁশ, বীজ, পাতার সবকিছু। ময়দা, বাটার, সস সব অনসাইট তৈরি হয়। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে উপাদান সংগ্রহ এবং কোনো প্লাস্টিক প্যাকেজিং ব্যবহার করা হয় না।
View this post on Instagram
জনপ্রিয় স্মোকড রেড কারি পাম্পকিন এর উদাহরণ। এখানে কুমড়ার ভেতরের মাংসল অংশ ব্রাইন ও স্মোক করা হয়। খোসা শুকিয়ে, এর সঙ্গে সিজনিং, বীজ দিয়ে সস তৈরি করা হয়। ভেতরের অংশ মার্মালেড বানাতে ব্যবহৃত হয়। সিলো-তে রান্না মানে শুধু স্বাদ নয়, এটি বিজ্ঞান, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতার সমন্বয়, এখানে “বর্জ্য হলো কল্পনার ব্যর্থতা।
জিরো ওয়েস্ট ড্যানিয়েলের টেকসই ফ্যাশনের গল্প
নিউইয়র্কভিত্তিক ফ্যাশন ডিজাইনার ড্যানিয়েল সিলভারস্টাইন শুধু পোশাক তৈরি করেন না তিনি তৈরি করছেন একটি জীবনধারা। তার ব্র্যান্ড 'জিরো ওয়েস্ট ড্যানিয়েল' আজ বিশ্বজুড়ে জিরো ওয়েস্ট ফ্যাশন আন্দোলনের প্রতীক। ২০১৭ সালে তার কাজ ভাইরাল হয়ে ৩৫ মিলিয়নেরও বেশি ভিউ পায় এবং এরপর সিএনএন, বিবিসি, ভোগ ও দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আলোচিত হয়েছে। ড্যানিয়েলের ধারণা স্পষ্ট; ফ্যাশন শিল্প পৃথিবীর অন্যতম বড় দূষণকারী, কিন্তু সৃজনশীল ডিজাইন ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের মাধ্যমে আমরা তা বদলাতে পারি।
View this post on Instagram
তাঁর প্রতিটি পোশাক ইউনিক এবং ল্যান্ডফিলে যাওয়া কাপড়ের পরিমাণ কমায়। শুধু পোশাক নয়, পুরো ব্র্যান্ডের কার্যক্রম জিরো ওয়েস্ট নীতিতে চলে—রিসাইকেলড প্যাকেজিং, অফিসে সচেতনতা এবং ক্রমাগত উন্নয়ন। বড় বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ দেখিয়েছে, জিরো ওয়েস্ট ফ্যাশন বড় ইন্ডাস্ট্রিতেও সম্ভব।রেস্ট, রিসেল ও থ্রিফটের অনলাইন ব্র্যান্ড নুলি (Nuuly-) র সঙ্গে কাজ করে ১,৩০০ পুরনো ডেনিম আপসাইকেল করে তৈরি করেছেন নতুন ১০টি ডিজাইন। ড্যানিয়েল এর মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছেন সাসটেইনেবল ফ্যাশন শুধু ছোট স্কেলে নয়, বড় ইন্ডাস্ট্রিতেও সম্ভব। ড্যানিয়েলের মতে, “জিরো ওয়েস্ট” কোনো প্রতিযোগিতা নয়, এটি একটি অভ্যাস। বাড়ি থেকেই শুরু করা যায় কম বর্জ্য, অতিরিক্ত প্যাকেজিং এড়িয়ে, একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্য কমিয়ে, ফাস্ট ফ্যাশন থেকে দূরে থাকলে। ড্যানিয়েল দেখিয়েছেন, একজন মানুষও পরিবর্তন আনতে পারে। টেকসই ফ্যাশন শুধু ট্রেন্ড নয়, এটি আমাদের সময়ের প্রয়োজন।
জিরো ওয়েস্ট জুয়েলারিতে টেকসই বিপ্লব
জুয়েলারি ইন্ডাস্ট্রিও দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ ও মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্নের মুখে। কিন্তু এখন অনেক ব্র্যান্ড এই চিত্র বদলাচ্ছে। এরকম কাজ করা উল্লেখযোগ্য ব্র্যান্ড হলো-
এজমেস (AGMES) যারা রিসাইকেলড মেটাল দিয়ে লোকাল প্রোডাকশন করে।
View this profile on Instagram
এসভিএনার (SVNR) তাঁরা আপসাইকেলড ও প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে কাজ করে। মিয়াদোলার্ক (Meadowlark) যাদের স্লোগান মেইড টু অর্ডার জিরো এক্সেস প্রোডাকশন (made-to-order, zero excess production)। এই ব্র্যান্ডগুলো বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে । যেগুলোর মধ্যে কনফিল্কট ফ্রি ডায়মন্ড, ফেয়ার ট্রেড ম্যাটেরিয়ালস এবং ফুল ট্রানপারেসি অর্থাৎ কোথা থেকে এসেছে, কে বানিয়েছে নিশ্চিত করা হয়। এখন অলংকার শুধু স্টাইল নয় এটি একটি নৈতিক অবস্থান। এই তিনটি ক্ষেত্রের মূল দর্শন একটাই পুনরব্যবহার এবং সংরক্ষণ। আগে ধারনা ছিল তৈরি করো → ফেলে দাও আর এখনকার ধারনা হচ্ছে তৈরি করো → পুনর্ব্যবহার করো → পুনরুজ্জীবিত করো।
যদিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো, সম্পূর্ণ “জিরো ওয়েস্ট” এখনো বাস্তবে পুরোপুরি সম্ভব নয়। সিলোর মতো প্রতিষ্ঠানও স্বীকার করে, তাদের কাছেও কিছু বর্জ্য থেকে যায়। তবে তারা এটিকে ব্যর্থতা হিসেবে নয়, বরং শেখার একটি অংশ হিসেবে দেখে। জিরো ওয়েস্টের এই ধারণাগুলো আমাদের শেখায়, একটি রেস্তোরাঁ খাবারের সংজ্ঞা বদলাতে পারে, একজন ডিজাইনার ফ্যাশনের ভাষা বদলাতে পারে এবং একটি ব্র্যান্ড অলংকারকে সচেতনতার প্রতীক করে তুলতে পারে। হয়তো আমরা একদিনেই পৃথিবী বদলাতে পারব না। কিন্তু প্রতিদিন যদি আমরা একটু কম বর্জ্য তৈরি করি, সেখান থেকেই শুরু হবে সত্যিকারের পরিবর্তন। কারণ, বর্জ্য মানে শেষ নয় এটি নতুন সম্ভাবনার শুরু। আর সেটাই জিরো ওয়েস্ট কনসেপ্টের মূল কথা।
সূত্র: ইকো সাইকেল, জিরো ওয়েস্ট ইউরোপ
ছবি: ইন্সটাগ্রাম