প্রাচীন এক মহুয়াবাগান
· Prothom Alo

পরমেশ্বর হেমব্রমের জীবনটাই কেটে গেল মহুয়াগাছের নিচে। একসময় এক হাতে মশাল ধরে আরেক হাতে কুড়িয়েছেন মহুয়া ফুল। সেদ্ধ করে রেখে দিয়েছেন। ছোলার সঙ্গে খেয়েছেন। বড়া ভেজে মেয়ের বাড়িতে নিয়ে গেছেন। আশপাশের সব গাঁয়ের মানুষই আসত ফুল কুড়াতে। দরগাডাঙ্গায় কে এত মহুয়াগাছ লাগিয়েছিলেন, কেউ বলতে পারেন না। পরমেশ্বরও না। তবে তাঁর মতে, এটা ‘জংলা বাগান’। মানে প্রাকৃতিকভাবেই বেড়ে উঠেছিল। কেউ বলছেন, ব্রিটিশদেরও আগে থেকে এই বাগান আছে। বয়সজনিত রোগে মরে ভেঙে পড়তে পড়তে এখনো ১১টি গাছ রয়েছে। তাতে ফুল ফুটেছে।
এই বাগানটি রাজশাহীর তানোর উপজেলার কলমা ইউনিয়নের দরগাডাঙ্গা গ্রামে। স্থানীয় উচ্চারণে এটি মোয়া বাগান। একসময় যেটি ‘জংলা বাগান’ ছিল, সেটি এখন দরগাডাঙ্গা বাজার। মহুয়াগাছের নিচে প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক হাট বসে।
Visit newsbetting.bond for more information.
মহুয়া বেশ বড় ধরনের পাতা ঝরানো বৃক্ষ। কাণ্ড দীর্ঘ, মসৃণ ও ধূসর রঙের। বসন্তের মাঝামাঝি সময়ে সারা গাছ ভরে থোকা থোকা অসংখ্য ফুল আসে। ফুল ও ফলের তৈরি পানীয় আদিবাসীদের প্রিয়। প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক মোকারম হোসেন তাঁর বাংলাদেশের পুষ্প-বৃক্ষ লতা-গুল্ম বইয়ে লিখেছেন, মহুয়াগাছ ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে সহজলভ্য। এর বিপন্নতা যাচাই হয়নি। মহুয়ার বৈজ্ঞানিক নাম: Madhuca longifolia অথবা ‘Madhuka indica’। স্থানভেদে একে মহুলা, মধুকা, মোহা, মোভা, মহুভা, মাদকম ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।
রাজশাহী শহর থেকে ৪৭ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে দরগাডাঙ্গায় যেতে যেতেই বেলা পড়ে এল। সন্ধ্যা হতে হতেই শুরু হলো বাদুড়ের কিচিরমিচির। মনে হচ্ছে, রাতের অন্ধকারে ক্ষেপণাস্ত্রের মতো একেকটা গাছের ডালে ঢুঁ মেরে চলে যাচ্ছে একেকটা বাদুড়। সেই ঝাঁকিতেই ঝরে পড়ছে কয়েকটা ফল। অবাক হয়ে বাদুড়ের কারবার দেখছি। আর মহুয়ার অচেনা ঘ্রাণে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছি। সঙ্গে রয়েছেন তানোরের দর্শনচর্চার সঙ্গে যুক্ত সোহরাব হোসেন (৬৫), রাজশাহীর উপহারসামগ্রীর ব্যবসায়ী জয়দেব শিকদার (৫৭) ও রাজশাহী আলোর পাঠশালার প্রধান শিক্ষক রেজিনা খাতুন। তাঁর বাবার বাড়ি সেখানে। সোহরাব হোসেনের দাবি, ‘তিনি সারা দেশে সফর করেছেন। এত বেশি মহুয়ার গাছ এক জায়গায় তিনি দেখেননি।’
আগন্তুক বুঝতে পেরে এগিয়ে এলেন পাশের চন্দনকোঠা গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম (৬৫)। বললেন, ‘এখন তো কী দেখছেন, আরও অনেক গাছ ছিল। দিনে দিনে মরে যাচ্ছে। কিন্তু কে বাগান করেছে, কেউ বলতে পারবে না। আমার বাবা ১১২ বছর বয়সে মারা গেছেন, তিনিও বলতে পারেননি। ব্রিটিশদেরও আগে এই বাগান হয়েছে।’
সিরাজুল বললেন, ‘আমরা মহুয়ার ফলের তেল দিয়ে পাকোয়ান পিঠা তৈরি করে খেয়েছি। খুবই সুস্বাদু। আর ফুল দিয়ে পায়েস রান্না করা হয়। আমরা নিজেও খেয়েছি।’
পাশের মোহাম্মদপুর গ্রামের শহিদুল ইসলাম (৫২) বললেন, ‘আগে গাছের বয়স কম ছিল, গাছও বেশি ছিল। এত ফুল ফুটত, গাছতলা থেকে ঝাড় দিয়ে ফুল নিয়ে যেতাম। ফুল দিয়ে পায়েস রান্না করতাম। সারা বাড়িতে সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। ফুল যত শুকাবে, কিশমিশের মতো মিষ্টি ঘ্রাণ হবে। শুকাতে শুকাতে গমের মতো চিকন হয়ে যাবে।’ এই কথা বলতে বলতে তিনি একটি ফল চায়ের দোকান থেকে ধুয়ে এনে এই প্রতিবেদকের মুখে গুঁজে দিলেন। শুধু মিষ্টি নয়, সুগন্ধেও মন ভরে গেল।
আলোচনায় যোগ দিলেন চন্দনকোঠা গ্রামের আবদুল আজিজ (৫৫)। তিনি বললেন, ‘আমার দাদা বাহার উদ্দিনও বলতে পারেনি যে এই গাছ কবে লাগানো হয়েছে। সবচেয়ে ভালো বলতে পারবে পরেম। এখানেই তার বাড়ি। বয়সেও সবার চেয়ে বড়।’
খুঁজে পাওয়া গেল পরেমকে। পুরো নাম জানতে চাইলে তিনিও বললেন, পরেম। মানুষ পরেম বলেই ডাকে। অনেক জেরার পরে তাঁর পুরো নাম পাওয়া গেল। পরমেশ্বর হেমব্রম।
পরমেশ্বরের কাছ থেকেই জানা গেল কোথায় কয়টি গাছ ছিল। কত বড় বাগান ছিল। মরতে মরতে আর ১১টি আছে। তাঁর ভাষায় একটা জংলা বাগান। তিনি বললেন, ‘মানুষ মোয়া ফুলের ক্ষীর-পায়েস রান্না করে খায়। যখন ফল হয় তখন বাদুড়ে খায়।’
পরমেশ্বর বললেন, মোয়াগাছের নিচেই জীবনটা কেটে গেল। নিজের ভাষায় মহুয়া ফুলের কথা শুনতে চাইলে বললেন, ‘মাতকম বাহা হেরেমগিয়া।’ বাংলা অর্থ ‘মহুয়া ফুল খুব মিষ্টি।’
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, রাজশাহী