নারী ক্ষমতায়ন: ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি এবার বাস্তবায়নের সময়

· Prothom Alo

আজ ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বজুড়ে দিনটি নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সমতার প্রশ্ন সামনে আনে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ দশমিক ৮৩ শতাংশ নারী হলেও শ্রমবাজারে তাঁদের অংশগ্রহণ মাত্র প্রায় ৪৪ দশমিক ১৫ শতাংশ (ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও আইএলও ২০২৪)। নির্যাতন, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক বাধা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

Visit lebandit.lat for more information.

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর নারীরা স্বাভাবিকভাবেই তাকিয়ে আছেন প্রতিশ্রুতিগুলোর দিকে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে নারী অধিকার ও ক্ষমতায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে এসেছে। এসব প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রেখে সাম্প্রতিক নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ভোট দিয়েছেন।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে নারী অধিকারকে জাতীয় উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখা হতো। তাঁর শাসনামলে রপ্তানিমুখী শিল্পনীতির ভিত্তি তৈরি হয়, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে।

পরবর্তী সময়ে এই শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং বর্তমানে প্রায় ৪২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, যার প্রায় ৬০ শতাংশ নারী (বিজিএমইএ ও আইএলও ২০২৪–২৫)। জিয়াউর রহমান নারীবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং সরকারি চাকরিতে নারীদের জন্য কোটা চালু করেন। মন্ত্রিসভায় নারীদের অন্তর্ভুক্তিও নারী নেতৃত্বের পথ উন্মুক্ত করে।

বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাঁর দুই মেয়াদে, নারী অধিকারে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর প্রথম মেয়াদে ‘ফিমেল সেকেন্ডারি স্কুল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম’ (১৯৯৪) চালু হয়, যা গ্রামীণ নারীদের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা বিনা মূল্যে করে। এর ফলে নারীদের স্কুল ভর্তির হার বেড়েছে, শিশুবিবাহ কমেছে এবং মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে।

১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যার ৮০ শতাংশ নারী হবে। পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার জন্য আরও শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক ও ইউনেসকোর গবেষণায় দেখা গেছে, এই কর্মসূচির ফলে মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের ভর্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশগুলোর একটি হয়ে ওঠে, যেখানে মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের উপস্থিতি ছেলেদের সমান বা বেশি হয়েছে। তাঁর সরকার প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও বিনা মূল্যে করে, নারীদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনা মূল্যে শিক্ষা এবং স্টাইপেন্ড চালু করে। স্বাস্থ্য খাতে ‘হেলথ, নিউট্রিশন অ্যান্ড পপুলেশন সেক্টর প্রোগ্রাম’ চালু করে মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্যসেবা বিস্তার করে, যা মৃত্যুর হার কমিয়েছে।

বিএনপির ইশতেহারে ‘নারী ক্ষমতায়ন’ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, নারীর অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হলে জাতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার শক্তিশালী হবে। সে লক্ষ্যে গ্রাম থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নারীর নেতৃত্ব, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সুরক্ষায় সুযোগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্প, যা নারীপ্রধান পরিবারের নামে ইস্যু করা হবে। এর মাধ্যমে নিম্ন আয়ের বা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল প্রায় ৫০ লাখ পরিবারকে মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা বা চাল, ডাল, তেল ও লবণের মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে।

বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সহায়তা সরাসরি নারীর হাতে গেলে পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা ও শিশুদের শিক্ষায় ব্যয় বাড়ে। পাশাপাশি পিতামাতার ভরণপোষণ আইন কার্যকর করার কথাও বলা হয়েছে।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার

শিক্ষাক্ষেত্রে বিএনপির প্রতিশ্রুতি আরও বিস্তৃত। ইশতেহারে বলা হয়েছে, নারীদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যন্ত শিক্ষা বিনা মূল্যে করা হবে। বর্তমানে নারীদের প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতা হার প্রায় ৭৬ দশমিক ৫ থেকে ৮০ শতাংশ হলেও উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ প্রায় ৩০ শতাংশে সীমিত। এই উদ্যোগ উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে এবং শিশুবিবাহ কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে, যা এখনো প্রায় ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ নারীর ক্ষেত্রে ঘটে (এমআইসিএস ২০২৫, বিবিএস-ইউনিসেফ)।

নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমন্বিত কর্মসূচির কথাও বলা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, হস্তশিল্প, কুটিরশিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কম্পিউটার সাক্ষরতা ও ডিজিটাল দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। গ্রামীণ অশিক্ষিত নারী ও গৃহিণীদের জন্য মাইক্রোক্রেডিট ও যন্ত্রপাতি সহায়তার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায় কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে।

স্বাস্থ্য খাতেও পরিকল্পনা রয়েছে। ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যার ৮০ শতাংশ নারী হবে। পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার জন্য আরও শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে।

নির্যাতন ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে ইশতেহারে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, অনলাইন হিংসা ও বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ প্রায় ৪৪ শতাংশ, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বড় উদ্বেগের বিষয়।

বিএনপি যেন ’৭১ ও ’২৪-কে ভুলে না যায়

ইউএনএফপিএ ও বিবিএসের ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, জীবনের কোনো না কোনো সময় ৭৬ শতাংশ নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং গত ১২ মাসে এ হার ৪৯ শতাংশ। তাই ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এ লক্ষ্যে ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী সাপোর্ট সেল গঠন, নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও দক্ষতা সহায়তা, কর্মক্ষেত্রে ডে কেয়ার, অফিস ও আদালতে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার এবং মাধ্যমিক ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য নির্ধারিত বাস সার্ভিস চালু ও স্থানীয় সরকারে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ও এক মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করার প্রস্তাব নারীদের কর্মজীবনকে আরও সহায়ক করতে পারে।

বাংলাদেশে অনেক কিশোরীর স্কুলে অনুপস্থিতির বড় কারণ মাসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ঘাটতি। ইউনিসেফের গবেষণা বলছে, পর্যাপ্ত স্যানিটারি সুবিধা না থাকায় অনেক মেয়ে মাসিকের সময় স্কুলে যেতে পারে না। স্কটল্যান্ড, কেনিয়া ও ভারতের কয়েকটি রাজ্যে স্কুলে বিনা মূল্যে স্যানিটারি পণ্য দেওয়ার পর কিশোরীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংক ও ম্যাককিন্সির গবেষণা অনুযায়ী, নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ পুরুষদের সমান হলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জিডিপি প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় অব্যবহৃত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।

এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি উঠেছে। দেশে নারীরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ দশমিক ৮৩ শতাংশ হলেও সহিংসতা, সীমিত রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও সামাজিক চাপ তাঁদের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক সুরক্ষা, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র ও চাইল্ড কেয়ার অবকাঠামো শক্তিশালী করা গেলে বাংলাদেশের উন্নয়ন আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে।

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সময় যেভাবে নীতিগত সিদ্ধান্ত নারীর অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি করেছিল, তেমনি আজও নতুন সরকারের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। নারী অধিকার ও ক্ষমতায়ন কেবল সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

প্রতিটি নারী যখন নিরাপদ, শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হবে, তখনই দেশ সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধ হবে। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন শুরু করতে পারলে নারী দিবসের আহ্বান বাস্তব অর্থ পাবে। এখন প্রয়োজন প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তব পদক্ষেপে যাওয়া।

  • সুবাইল বিন আলম, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক

    ই-মেইল: contact@subail. com

    *মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source