২৫ মার্চের গণহত্যা, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের সূচনা

· Prothom Alo

১৯৭১ সালের মার্চে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ প্রথমে রূপ নেয় সুসংগঠিত অসহযোগ আন্দোলনে। একপর্যায়ে আকার নেয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের। সেসব ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

Visit moryak.biz for more information.

১৯৭১ সালের ২ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়েছিল। এ আন্দোলনের মধ্যেই ১৬ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের কয়েক দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২২ মার্চ অনুষ্ঠিত তাঁদের এই বৈঠকে যোগ দেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান (পিপিপি) জুলফিকার আলী ভুট্টো।

বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ভবনে। এদিন সেখানে ব‍্যাপক জনসমাবেশ ঘটে। প্রধান ফটকের অদূরে জনতা শেখ মুজিবের সমর্থনে ও ভুট্টোর বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। ইয়াহিয়া-মুজিব–ভুট্টোর বৈঠক চলাকালেই ২৫ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করা হয়। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আবার স্থগিত ঘোষণা সম্পর্কে পরে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ মুজিব সাংবাদিকদের বলেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগ দেবেন না। সে অনুসারেই প্রেসিডেন্ট পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেছেন।

অসহযোগ আন্দোলনের ২১তম এই দিনেও বিভিন্ন সংগঠনের সভা-সমাবেশ-মিছিল চলতেই থাকে। বায়তুল মোকাররমের সামনে সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক বাঙালি সৈনিক, নাবিক ও বৈমানিকদের সমাবেশ ও কুচকাওয়াজ হয়। সেখানে বক্তারা বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে অভূতপূর্ব ঐক্য গড়ে উঠেছে, তাতে সাবেক সৈনিকেরা আর সাবেক হিসেবে বসে থাকতে পারেন না।

পাকিস্তান দিবসে উড়ল স্বাধীন বাংলার পতাকা

১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল একটি ব্যতিক্রমী দিন। অন্যান্য বছর দিনটি ‘পাকিস্তান দিবস’ হিসেবে পালিত হতো। কিন্তু একাত্তরের এই দিনে সারা বাংলায় উড়ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ঢাকার প্রেসিডেন্ট ভবন, গভর্নর ভবন, বিমানবন্দর ও সেনানিবাস ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা ওড়েনি। সকালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাসভবনে শেখ মুজিব স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঢাকার রাজপথ সংগ্রামী জনতার মিছিলে প্রকম্পিত হয়।

ঢাকায় সচিবালয়, হাইকোর্ট ও জাতীয় পরিষদ ভবন, ইপিআর ও পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা বেতার ও টেলিভিশন কেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, টেলিফোন ভবন, হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ও প্রদেশের মুখ্য সচিবের বাসভবনসহ সব সরকারি-বেসরকারি ভবন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলার পতাকা তোলা হয়।

‘স্বাধীনতার সংগ্রাম চলবে’

২৪ মার্চ সরকারি অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হরতাল পালিত হয়। সারা বাংলায় লাগাতার অসহযোগ আন্দোলনের মুখে সামরিক সরকারের লোকজন বোমাবাজি ও হামলা শুরু করে। তারা ঢাকার মিরপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, সৈয়দপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সহিংস ঘটনা ঘটায়। এদিন চট্টগ্রামে জনতা-সেনাবাহিনী সংঘর্ষ হয়। এ ছাড়া দেশের কয়েকটি স্থানে সেনাবাহিনীর উসকানিতে অবাঙালিরা বাঙালিদের ওপর হামলা চালায়।

২৪ মার্চ বিকেলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দল চট্টগ্রাম বন্দরের ১৭ নম্বর জেটিতে নোঙর করা এমডি সোয়াত জাহাজ থেকে সমরাস্ত্র খালাস করতে যায়। খবর পেয়ে হাজার হাজার শ্রমিক-জনতা বন্দরে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের ঘিরে ফেলে। জনতা জেটি থেকে কদমতলী পর্যন্ত চার মাইল পথের বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড দেয়। সেনাবাহিনীর সদস্যরা জাহাজ থেকে কিছু অস্ত্র নিজেরাই খালাস করে। সেসব অস্ত্র ট্রাকে তুলে নতুন পাড়া সেনানিবাসে আনার সময় ডবলমুরিং রোডে একটি ব্যারিকেডে দাঁড়িয়ে জনতা তাদের পথ রোধ করে। রাতে সেনারা গুলিবর্ষণ করলে বহু শ্রমিক-জনতা নিহত হন।

নিষ্ঠুরতম গণহত্যার সূচনা

২৪ মার্চ থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা তড়িঘড়ি করে ঢাকা ত্যাগ করছিলেন। খবরটি দিনভর নানা জল্পনার জন্ম দেয়। ২৫ মার্চ সন্ধ্যা সাতটার দিকে ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ছাড়লে গুজবের সঙ্গে যুক্ত হয় আশঙ্কা। শহর থমথমে হয়ে পড়ে। মানুষ আঁচ করতে পারছিল, কিছু একটা হতে যাচ্ছে। তবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে গণহত্যার পরিকল্পনা নিয়ে রাতের অন্ধকারে নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, তা ছিল কল্পনার বাইরে।

সেনাবাহিনী অভিযান শুরু করবে, এই অনুমান থেকে ছাত্র-জনতা সন্ধ্যার দিকেই রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দিতে শুরু করে। রাত নয়টার পর শেখ মুজিব তাঁর বাসভবনে দলের নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও ইয়াহিয়া সামরিক সমাধান খুঁজছেন। এর মাধ্যমে তিনি অখণ্ড পাকিস্তানের সমাপ্তি টানতে চলেছেন। রাত ১০টায় তিনি কিছু নির্দেশ জারি করে জনতাকে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

রাত ১১টার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর শুরু করে ‘অপারেশন সার্চলাইট’। ব্যাপক নিধনযজ্ঞের প্রস্তুতি নিয়ে তারা বেরিয়ে আসে ঢাকাসহ বড় বড় শহরে। ছাত্র-জনতা বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। সাঁজোয়া যানের আওয়াজ, গুলির শব্দ, গোলার বিস্ফোরণ আর মানুষের আর্তচিৎকারে ঢাকা বিভীষিকার শহরে পরিণত হয়।

সেনাবাহিনী পিলখানায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) সদর দপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ব্যাপক হামলা চালায়। রাত আনুমানিক একটায় তারা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা দখল করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। খুঁজে খুঁজে হত্যা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। পিলখানায় ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে বাঙালি সেনা ও পুলিশ পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধের চেষ্টা করে। তবে পাকিস্তানি সেনাদের ভারী অস্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ টেকেনি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রাত দুইটার পর ইপিআর হেডকোয়ার্টার এবং ভোরে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস দখল করে নেয়।

শেখ মুজিবকে আটক ও স্বাধীনতার ঘোষণা

অপারেশন সার্চলাইট শুরু করার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি কমান্ডো দল ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে (রাত দেড়টার দিকে) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আটক করে। কোনো কোনো বই ও নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, আটক হওয়ার আগেই শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে যান। তবে স্বাধীনতার এই ঘোষণা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। 

২৬ মার্চ বেলা ২টা ১০ মিনিট এবং ২টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ পাঠ করা হয়। আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম জেলা শাখার নেতা এম এ হান্নান ‘বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ থেকে নিজ নামে এ ঘোষণা পাঠ করেন। ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বেতারের কালুরঘাট ট্রান্সমিশন স্টেশন থেকে প্রথমবার নিজ নামে এবং কিছুক্ষণ পর সংশোধন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন তৎকালীন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমান।

স্বাধীনতা ঘোষণাগুলোর মধ্যে জিয়াউর রহমানের ঘোষণাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, তাঁর এ ঘোষণাটি মুক্তিকামী মানুষ, বিশেষভাবে বাঙালি সেনাসদস্যদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত ও ঐক্যবদ্ধ করেছিল। এ প্রসঙ্গে ১৯৭১: ভেতরে বাইরে বইয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ বাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ এ কে খন্দকার লিখেছেন, ‘২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের রূপ নেয়। এখান থেকে প্রথমে স্থানীয় নেতারা ও পরে মেজর জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম, পরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ও রাষ্ট্রপতি) বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। আমি মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা শুনি এবং চট্টগ্রামে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার কথা জানতে পারি। এই ভেবে উৎফুল্ল হই যে আমরা আক্রান্ত হয়ে চুপ করে নেই, আমরা আক্রমণও শুরু করেছি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।...’

প্রয়াত রাজনীতিক ও বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ তাঁর বাংলাদেশ: স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা বইয়ে লিখেছেন, ‘৩০শে মার্চ জিয়া আবার একটি বেতার ভাষণ দেন এবং এবারে তিনি শেখ মুজিবের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা না জেনে এবং তাঁর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না করেই ঘোষণা করেন যে তিনি শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে কাজ করে চলেছেন। তিনি এবার সরকারপ্রধানের পরিবর্তে মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার ইন চিফের দায়িত্বও হাতে তুলে নেন। মুজিব ছিলেন যাঁদের কাছে একজন আদর্শস্বরূপ সে জনগণের নৈতিক মনোবল অটুট রাখার উদ্দেশ্যেই জিয়া এই ঘোষণাটি করেন। জিয়ার এই ঘোষণাগুলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে বাঙালী আর্মী অফিসারদের অনুপ্রাণিত করে ও প্রতিটি ক্ষেত্রে বাঙালীদের কাছে প্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় জেড ফোর্সের অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান মুক্তাঞ্চলে নদীপথ পর্যবেক্ষণ করছেন

জায়গায় জায়গায় প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু

২৫ মার্চের গণহত্যা আর ২৬ ও ২৭ মার্চের উপর্যুপরি স্বাধীনতার ঘোষণার যুগপৎ প্রভাব পরের দিনে লক্ষ করা যায়। মানুষের মনের গভীরে অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুভীতি ছিল। ২৮ মার্চ ঢাকায় সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সান্ধ্য আইন শিথিল করা হয়। হাজার হাজার সন্ত্রস্ত মানুষ আগের দিনের মতোই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে শহর ছাড়তে শুরু করে। এর পাশাপাশি দেশের নানা স্থানে বাঙালিরা পাকিস্তান সেনাদের সঙ্গে প্রতিরোধযুদ্ধ চালায়। এই দিনেও শহরের রাস্তার পাশে পড়ে ছিল নিহতদের লাশ। রাতে চট্টগ্রামের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যের জন্য আবারও বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের ব্যাপ্তিকাল অনেক দীর্ঘ। এর শুরু হয়েছিল নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এবং শেষ হয়েছিল সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে। এর মধ্যে ১৯৭১ সালের মার্চ মাস ছিল খুবই ঘটনাবহুল। ২৫ মার্চে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম গণহত্যার পর বাঙালিদের আর পেছনে ফেরার কোনো সুযোগ ছিল না; যেকোনো মূল্যে স্বাধীনতা অর্জনই হয়ে পড়ে মোক্ষ, আর এভাবেই হয় মুক্তিযুদ্ধের সূচনা।

তথ্যসূত্র

১. একাত্তরের দিনপঞ্জি: মুক্তিযুদ্ধের দৈনিক ঘটনালিপি, সম্পাদক: সাজ্জাদ শরিফ, প্রথমা প্রকাশন, ২০২৩।

২. ১৯৭১: ভেতরে বাইরে, এ কে খন্দকার, প্রথমা প্রকাশন, ২০১৪।

৩. বাংলাদেশ: স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা, মওদুদ আহমদ, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ১৯৯২।

মনজুরুল ইসলাম: প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

Read full story at source