সুই–সুতা বা বুননের কাজ যেভাবে আপনার মানসিক অস্থিরতা কমাবে
· Prothom Alo
সাম্প্রতিক সময়ে নিটিং বা ক্রোশেইং আবার নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। শুধু ফ্যাশন বা শখ হিসেবে নয়; বরং মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার একটি সম্ভাব্য সহায়ক পদ্ধতি হিসেবেও নিটিং নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।
Visit grenadier.co.za for more information.
মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে বুননকাজে বেশ সাহায্য করেসামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আজকাল অনেককেই দেখা যায় উল দিয়ে বুনছেন পোশাক, মাফলার বা ঘর সাজানোর সামগ্রী। তরুণ অনেকেই আগ্রহভরে শিখছেন এই কাজ। একটা সময় যেটা দাদি-নানিদের শখের কাজ ছিল, আধুনিক জীবনে সেটাই যেন নতুন করে ফিরে এসেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাই নিটিং বা ক্রোশেইং আবার নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। শুধু ফ্যাশন বা শখ হিসেবে নয়; বরং মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার একটি সম্ভাব্য সহায়ক পদ্ধতি হিসেবেও নিটিং নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, সুই–সুতার বুনন মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, এমনকি কিছু ক্ষতিকর অভ্যাস থেকেও দূরে থাকতে সহায়তা করতে পারে, যেমন পরনিন্দা, পরচর্চা, অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার বা ধূমপানের মতো আসক্তি।
এক ব্যক্তিগত পরিবর্তনের গল্প
সুই–সুতার বুননে তৈরি হচ্ছে নকশিকাঁথাকানাডার মিসিসাগায় বসবাস করেন আমান্ডা উইলসন। শৈশব থেকেই তিনি অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডারে ভুগতেন। যার জন্য সব সময়ই অস্থিরতার মধ্যে কাটাতেন তিনি। এই হয়তো হাতের নখ কামড়াচ্ছেন অথবা মাথার ত্বক আঁচড়ে ধরছেন। পরে তিনি নিটিংকে ধীরে ধীরে তাঁর অভ্যাসে পরিণত করেন। আর এই সুই–সুতার বুননই তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন এনে দেয়। তিনি আর আগের মতো অস্বাভাবিক আচরণ করেন না। তাঁর ভাষায়, ‘আমি যেন এখন সুতা বোনাতেই মগ্ন হয়ে যাই।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি গাড়ির সবচেয়ে নিরাপদ আসনশখ নাকি থেরাপি
সেলাই বা বুননকাজের পুনরাবৃত্তিমূলক হাতের নড়াচড়া মস্তিষ্কের ওপর একধরনের শান্ত প্রভাব ফেলেবুননের কাজ নিয়ে গবেষণা এখনো খুব বেশি নেই। তবে যাঁরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন, তাঁদের মতে, এই সাধারণ কাজের ভেতরে মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক কার্ল বারমিংহাম বহু বছর ধরে বুননের সম্ভাব্য মানসিক উপকারিতা নিয়ে কাজ করছেন। ২০০৯ সালে তিনি খাবারসংক্রান্ত মানসিক সমস্যায় ভোগা তরুণীদের নিয়ে চিকিৎসাকেন্দ্রে একটি গবেষণা চালান। সেখানে অনেক অ্যানারেক্সিয়া নার্ভোসা (ওজন বাড়ার ভয়ে খাদ্য গ্রহণে চরম অনীহা) ও বুলিমিয়া নার্ভোসা (অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার পর ওজন কমানোর জন্য জোর করে বমি, জোলাপ আর অত্যধিক ব্যায়াম করে তা কমানোর প্রবণতা) রোগীই ছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারীরই বুননের কাজ করার কারণে এ উদ্বেগ কমে যায়।
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সেলাই বা বুননকাজের পুনরাবৃত্তিমূলক হাতের নড়াচড়া মস্তিষ্কের ওপর একধরনের শান্ত প্রভাব ফেলে। দুই হাত একই ছন্দে কাজ করার ফলে মস্তিষ্কের দুই পাশই সক্রিয় থাকে। অনেক গবেষক এটিকে আই মুভমেন্ট ডিসেন্সিটাইজেশন অ্যান্ড রিপ্রসেসিং (ইএমডিআর) থেরাপির সঙ্গে তুলনা করেন, যা সাধারণত ট্রমা বা উদ্বেগজনিত সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়।
এ ছাড়া পুনরাবৃত্তিমূলক এই কাজ শরীরের প্যারাসিম্পেথেটিক নার্ভাস সিস্টেমকে সক্রিয় করতে পারে, যা শরীরকে ধীরে ধীরে চাপমুক্ত অবস্থায় ফিরিয়ে আনে। ফলে মন শান্ত হতে শুরু করে এবং মনোযোগও বাড়তে থাকে।
খারাপ অভ্যাস ছাড়তে সহায়তা করে
সেলাইয়ের কাজে দুই হাত একই ছন্দে কাজ করার ফলে মস্তিষ্কের দুই পাশই সক্রিয় থাকেসেলাই বা বুননের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি হাতকে ব্যস্ত রাখে। ফলে বিভিন্ন বদঅভ্যাস থেকে দূরে থাকা যায়। যাঁরা ধূমপান, নখ কামড়ানো বা অযথা ফোন স্ক্রল করার মতো অভ্যাস ছাড়তে চান, তাঁদের জন্য এটি একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। ধারণাটি হ্যাবিট রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি নামে পরিচিত, অর্থাৎ ক্ষতিকর অভ্যাসের জায়গায় একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাসকে স্থাপন করা। উদাহরণ হিসেবে নেদারল্যান্ডসের লুস ভিনস্ট্রার কথাই ধরা যাক। তিনি ধূমপানের আসক্তি ছাড়তে ৫৫০টির বেশি সোয়েটার বুনেছিলেন। আবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার এক প্রযুক্তি ব্যবস্থাপকের প্রায় ৪৬ বছর ধরে ধূমপানের অভ্যাস। নানা পদ্ধতিতে চেষ্টা করেও এই বদভ্যাস তিনি ছাড়তে পারেননি। শেষ পর্যন্ত সেলাইয়ের আশ্রয় নেন। ধীরে ধীরে তাঁর ধূমপানের অভ্যাস কমতে শুরু করে। তিনি বলেন, ধূমপানের যে পুনরাবৃত্তিমূলক রুটিন ছিল, নিটিং অনেকটা সে জায়গাই পূরণ করে।
সেলাই বা বুননকাজ শেখা শুরুতে খুব সহজ না–ও হতে পারে। শুরুতে সুতা খুলে যাওয়া, ভুল সেলাই বা নকশা নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো ছোট ছোট ঝামেলা নতুনদের হতাশ করতে পারে। তবে যাঁরা এই শখ নিয়মিত চালিয়ে যান, তাঁদের অনেকেই বলেন, সেলাই বা বুননের পুনরাবৃত্তিমূলক ছন্দ মনকে অদ্ভুতভাবে শান্ত করে। সুই আর সুতা দিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া একটি স্কার্ফ বা টুপি হয়তো খুব বড় কিছু নয়। কিন্তু সেই ছোট ছোট ফোঁড়েই আপনি হয়তো খুঁজে পেতে পারেন মানসিক প্রশান্তি।
সূত্র: বিবিসি